………………….يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا

আল কোরআনে শিষ্টাচার শিক্ষা

শাইখ নুর আহমাদ তালহা

 

মহান আল্লাহ কালামে পাকে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَقُولُوا رَاعِنَا وَقُولُوا انْظُرْنَا وَاسْمَعُوا وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيم
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা ‘রায়িনা’ বলো না, ‘উনযুরনা’ বল এবং শুনতে থাক। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।(১)

আয়াতের শানে নুজুল
ابن عباس : كان المسلمون يقولون للنبي صلى الله عليه وسلم : راعنا. على جهة الطلب والرغبة – من المراعاة – أي التفت إلينا ، وكان هذا بلسان اليهود سبا ، أي اسمع لا سمعت ، فاغتنموها وقالوا : كنا نسبه سرا فالآن نسبه جهرا ، فكانوا يخاطبون بها النبي صلى الله عليه وسلم ويضحكون فيما بينهم ، فسمعها سعد بن معاذ وكان يعرف لغتهم ، فقال لليهود : عليكم لعنة الله! لئن سمعتها من رجل منكم يقولها للنبي صلى الله عليه وسلم لأضربن عنقه ، فقالوا : أولستم تقولونها ؟ فنزلت الآية ،.
ভাবার্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, মুসলমানরা আল্লাহর রাসুলকে তাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা বা কোনো কিছু জানতে ‘রায়িনা’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। যা المراعاة থেকে নির্গত। অর্থাৎ আমাদের প্রতি লক্ষ্য করুন। আর এই শব্দটিই ইহুদিদের ভাষায় গালি হিসাবে ব্যবহৃত হত। সুতরাং তারা এক মহা সুযোগ পেয়ে গেল। এবং তারা বলতে লাগল, আমরা তো এতদিন তাকে গোপনে গালি দিতাম এখন থেকে এই শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ্যে গালি দিতে পারব। তাই তারা আল্লাহর নবিকে এই শব্দ দিয়ে আহবান করত ( যেন মনে হত তারা স্বাভাবিক অর্থেই ব্যবহার করছে। অথচ তাদের নিয়ত ছিল খারাপ) আর নিজেদের মধ্যে এটা নিয়ে হাসাহাসি করত। অতঃপর হযরত সাদ ইবনে মাআজ রা. এটা শুনতে পেলেন আর তিনি তাদের ভাষা ( উদ্দেশ্যও) বুঝে ফেললেন। তাই তিনি ইহুদিদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হোক। আমি যদি তোমাদের কারো কাছ থেকে এই শব্দ দিয়ে নবিকে আহবান করতে শুনি, অবশ্যই তার গর্দান উড়িয়ে দিব। তখন তারা বলল, তোমরা কি এই শব্দ ব্যবহার কর না। এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। (২)

হুকুম
১. কথা-বার্তায় সর্বোচ্চ আদব রক্ষা করা ও শব্দচয়নে সতর্ক দৃষ্টি রাখা
فقد أمر الله تعالى المؤمنين أن يراعوا الأدب في مخاطبة نبيهم صلى الله عليه وسلم تجنباً للكلمات المشبوهة؛ ككلمة: راعنا، إذ قد تكون من الرعونة، ولما تدل عليه صيغة المفاعلة؛ إذ كأنهم يقولون: راعنا نُراعك، وهذا لا يليق أن يخاطب به الرسول صلى الله عليه وسلم.

ভাবার্থ: আল্লাহ পাক এই আয়াতে মুুমিনদের আল্লাহর রাসুলকে আহবান করার ক্ষেত্রে আদবের লেহাজ করতে বলেছেন। যাতে তারা সন্দেহপূর্ণ ও দিমুখী শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে পারে। যেমন: রায়িনা শব্দ। (এটা ভালো-মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়) এটা একটি অভিমত অনুযায়ী الرعونة থেকে নির্গত হয়েছে । (৩) যার অর্থ আহমক-বেকুব। আর এটা যেহেতু المفاعلة এর সমজাতীয় শব্দ থেকে নির্গত। তাই তার অর্থ হবে, যেন তারা বলে, যদি আপনি আমাদের কথা শুনুন তাহলে আমরাও আপনার কথা শুনব। অর্থাৎ একপ্রকার শর্ত জুড়ে দেওয়া। আর এভাবে আল্লাহর রাসুলকে সম্বোধন করে কথা বলা অনুচিত। (৪)

পবিত্র কোরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেন,
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا
অর্থ: রাসুলকে আহবান করার ক্ষেত্রে তোমারা তোমাদের একে অপরকে আহবান করার মতো করে করো না।(৫)

২. প্রিয় নবি সা. এর প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা কুফরি
أمرهم أن يسمعوا لنبيهم إذا خاطبهم حتى لا يضطروا إلى مراجعته، إذ الاستهزاء بالرسول والسخرية منه ومخاطبته بما يفهم الاستخفاف بحقه وعلو شأنه وعظيم منزلته كفر بواح
আল্লাহ পাক মুমিনদের নবির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বলেছেন যখন তিনি তাদের সম্বোধন করে কিছু বলেন। যাতে তাদের কারণে নবিকে কোনো কথা পুনরায় বলতে না হয়। কেননা আল্লাহর রাসুলকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা বা এমন শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা যার দ্বারা রাসুলের মহান ব্যক্তিত্বে, ঊচুঁ মর্যাদায় কোনো প্রকার হালকা ভাব বা ধৃষ্টতা প্রকাশ পায় এটা সুস্পষ্ট কুফরি। (৬)

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
অর্থ: আর যারা আল্লাহর রাসুলে প্রতি কুৎসা রটনা করে (ব্যঙ্গ করে) , তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।(৭)

৩. সকল জায়েজ কাজ না করা উচিত
ففيه النهي عن الجائز، إذا كان وسيلة إلى محرم،
ভাবার্থ: এই আয়াতে এমন কিছু জায়েজ কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কোনো হারাম কাজ সংগঠিত হওয়ার মাধ্যম হয়।(৮)  অর্থাৎ রায়িনা বলা যদিও জায়েজ। তবুও এটা বলা যাবে না। কেননা এটা দ্বারা রাসুলের প্রতি বিদ্রুপ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৪. কাফেরদের সাদৃশ্য গ্রহণ না করা
ففيه دلالة على النهي الشديد والتهديد والوعيد، على التشبه بالكفار في أقوالهم وأفعالهم، ولباسهم وأعيادهم، وعباداتهم وغير ذلك من أمورهم التي لم تشرع لنا
ভাবার্থ: এই আয়াতে মুমিনদের কাফেরদের সঙ্গে কথা-কাজে, পোষাক-পরিচ্ছদে, উৎসবে এবং ইবাদতসহ অন্য সকল ক্ষেত্রে যা শরিয়তসম্মত না, সাদৃশ্য গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং কঠিন ধমকি ও শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। (৯)

এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ.

অর্থ: যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, তে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। (১০)

পাঁচটি শিক্ষা:
১. কথা বলার সময়ে আদবের প্রতি যথাযথ প্রতি খেয়াল করা। অর্থাৎ এমন সকল শব্দ থেকে বেঁচে থাকা যাতে গালাগালের আশঙ্কা থাকে।
ينبغي استعمال الأدب في الألفاظ؛ يعني أن يُتجنب الألفاظ التي توهم سبًّا، وشتماً؛

২. ইমান উত্তম চরিত্রের প্রত্যাশা করে। কেননা শব্দচয়নের ক্ষেত্রে শিষ্টাচারের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।
أن الإيمان مقتضٍ لكل الأخلاق الفاضلة؛ لأن مراعاة الأدب في اللفظ من الأخلاق الفاضلة

৩. যে ব্যক্তি কোনো কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে তার উচিত বিকল্প আরেকটা বৈধ কাজের নির্দেশনা দেওয়া। কেননা কেননা শুধু নিষেধ করেই ক্ষান্ত দেওয়া আর তারা বিকল্প বলে না দেওয়া। এটা দ্বারা মানুষ পেরেশানিতে পরে যায়।أنه ينبغي لمن نهى عن شيء أن يدل الناس على بدله المباح؛ فلا ينهاهم، ويجعلهم في حيرة

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করা আবশ্যক।
وجوب الانقياد لأمر الله ورسوله؛

৫. আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণের প্রতি ভীতি প্রদর্শন করা। কেননা তা কাফেরদের কাজ।  (১১)
التحذير من مخالفة أمر الله، وأنها من أعمال الكافرين؛

সুতরাং প্রতিটি ব্যক্তি বিশেষভাবে মুসলমানদের ইমানি দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহর রাসুলের সম্মানের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। এবং কথা-কাজে বা অন্য কোনোভাবে যাতে তাঁর মহান ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও ইজ্জত-আব্রুর প্রতি আঘাত না আসে সে ব্যাপারে সতর্ক থাক।

 

সুরা বাকারা আয়াত ১০

২.আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন খ.২ পৃ. ৫৭

৩.  أو من الرعونة التي هي الحمق والخفة আল-ওয়াসিত লিসাইয়িদ তানতাবি খ. ১ পৃ. ১৭৭

৪. আইসারুত তাফাসির লিল কালামিল আলিইয়িল কাবির খ. ১ পৃ. ৯৪

৫.সুরা নুর আ. ৬৩

৬.  আইসারুত তাফাসির লিল কালামিল আলিইয়িল কাবির খ. ১ পৃ. ৯৪

৭.  সুরা তাওবা আ. ৬১

৮.   আইসারুত তাফাসির লিল কালামিল আলিইয়িল কাবির খ. ১ পৃ. ৯৪

৯.   তাফসিরে ইবনে কাসির খ. ১ পৃ. ৩৭৩

১০. সুনানে আবু দাউদ হা. নং ৪০৩৩

১১. তাফসিরুল কুরআন লিল ওসাইমিন

১২.  তাফসিরে ইবনে কাসির খ. ১ পৃ. ৩৭৩

Top