ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য

মুহাম্মাদ রাসেল উদ্দীন

‘অধিকার’ বলতে সাধারণত; মানুষের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করার ক্ষমতাকে বুঝায়। কিন্তু রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় অধিকার একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে মানুষ যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তা হচ্ছে অধিকার। রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত কতকগুলো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাকে বুঝায়, যার দ্বারা ব্যাক্তি তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও সমাজের মঙ্গল সাধন করে।

অধিকার সাধারণত দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি হল নৈতিক অধিকার এবং দ্বিতীয়টি আইনগত অধিকার। নৈতিক অধিকার বলতে সে সমস্ত অধিকারকে বুঝায় যা সমাজের ন্যায়বোধ থেকে উদ্ভুত। যেমন- ভিক্ষুকের ভিক্ষা লাভের অধিকার, দুর্বলের সাহায্য লাভের অধিকার ইত্যাদি। নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয় না। নৈতিক অধিকার ভঙ্গের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক কোন প্রকার শাস্তি দেওয়া হয় না। সমাজে তার কর্মের সমালোচনা-ই তার শাস্তি।

পক্ষান্তরে, আইনগত অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত। এ অধিকার ভঙ্গকারীকে রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পারে। আইনগত অধিকার আবার তিন ভাগে বিভক্ত। যথা- ১। সামাজিক অধিকার ২। রাজনৈতিক অধিকার ৩। অর্থনৈতিক অধিকার। এখানে শুধুমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের আইনগত অধিকার নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ-

০১. সামাজিক অধিকার
ক) জীবনের নিরাপত্তা অধিকারঃ- ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অন্যায়ভাবে হত্যা না হওয়ার ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্র পরিপূর্ণ গ্যারান্টি দিয়েছে। আর বিনা অপরাধে কাউকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তোমরা কোন বৈধ কারণ ছাড়া আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন এরুপ কাউকে হত্যা করো না।” এছাড়া শিশু হত্যা বা ভ্রম হত্যাও ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেমন পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- “তোমরা দারিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না, কেননা আমিই তাদের বিশেষত; তোমাদের রিযিক প্রদান করি, নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা বড় ধরণের অপরাধ।”

খ) খাদ্য ও জীবিকার অধিকারঃ- খাদ্য ও জীবিকার মালিক স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। মানুষ তার চেষ্টার দ্বারা জীবিকার্জন করে। আর ইসলামী রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যথাযথভাবে খাদ্য ও জীবিকার অধিকার প্রদান করে। রাষ্ট্রের কর্তব্য হবে এমন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে প্রত্যেক নাগরিক জীবিকার্জন করতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি নিজ চেষ্টায় সম্মানজনক জীবিকা না পায়, তবে রাষ্ট্রের কর্তব্য তার জীবিকার ব্যবস্থা করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এসেছে “আর জমিনে এমন কোন প্রনী নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেনি”। অন্য আয়াতে এসেছে, “আমি তোমাদের জীবিকার দায়িত্ব নিচ্ছি এবং তোমাদের সন্তানদেরও”।
গ) গতিবিধির অধিকারঃ- ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের চলা ফেরার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিকগণ নিজ রাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে পূর্ণমাত্রায় চলাফেরা করতে পারবে। আর এর মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সারাবিশ্বের যোগসূত্র স্থাপিত হবে। ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে ভ্রমন করার ব্যপারে পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-“তোমরা জমিনের পরতে পরতে ভ্রমণ কর এবং তার ফলে উপার্জিত রিজিক আহার কর”। (সূরা মুলক -১৫) এছাড়াও ইসলামে হজ্জ্বের বিধান এ কথায় প্রমান করে যে, বিশ্বের সকল স্থানের লোকজন নিজ দেশসহ সকল স্থানে যাতায়াত করতে পারবে। সুতারাং, ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের চলা-ফেরার অধিকার স্বীকৃত।

ঘ) ধর্ম চর্চার অধিকারঃ- ধর্মচর্চার অধিকার বলতে ব্যক্তির ইচ্ছামত ধর্ম পালন করার স্বাধীনতাকে বুঝায়। প্রত্যেক নাগরিক ইচ্ছামত ধর্মগ্রহণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন ও প্রচার করতে পারবে। ইসলামী আইন কারোর ধর্মে হস্তক্ষেপ করা নিষিদ্ধ করেছে। যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে,“ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই”। (সূরা বাকারা -২৫৬) অন্য আয়াতে এসেছে, “মুমিন হবার জন্য আপনি কি লোকদেরকে বাধ্য করবেন”? (সূরা ইউনুস -৯৯) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করাও ইসলামী আইনে স্বীকৃত। এ বিধান অনুযায়ী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উপাসানলয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করাও ইসলামী রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। আবার ধর্মীয় শিক্ষার ব্যপারে পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত। ধর্মীয় অনুভূতির পবিত্রতা ইসলামে স্বীকৃত। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী বা ধর্মের বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য করা অথবা ধর্মীয় নেতাদের গালমন্দ করা ইসলামী রাষ্ট্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে যে সকল উপাস্যকে ডাকছে, তোমরা তাদেরকে গালি দিওনা”। (সূরা আনয়াম -১০৮)
(উল্লেখ্য যে, ধর্মের মতভেদ নিয়ে সমালোচনা করা যেতে পারে, তবে তা হতে হবে উত্তম পন্থায়। যেন কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে।)

ঙ) বাক স্বাধীনতা বা মতামত প্রকাশের অধিকারঃ- বাক স্বাধীনতা বলতে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারকে বুঝায়। ব্যাপকার্থে- মতামত প্রকাশের অধিকার, লেখার অধিকার, আদর্শ প্রচারের অধিকার, সংবাদপত্র প্রকাশের অধিকার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রভৃতি বাক স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম নির্বিঘেœ সত্য প্রকাশ ও মতামত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্তব্য হচ্ছে, সত্য কথা নির্ভিকচিত্তে প্রকাশ করা। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-“আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের যাবতীয় কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত” (সূরা নিসা -১৩৫)। সরকারের সকল কার্যক্রমের উপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখা ও সজাগ থাকা এবং কোন ক্রুটি পরিলক্ষিত হলে তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা নাগরিকের অধিকার। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন- “অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ”। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রাঃ) জনসমাবেশে বক্তৃতাকালে বলেছিলেন-“ যদি আপনারা আমার মধ্যে কোন ক্রুটি লক্ষ করেন তবে আমাকে সংশোধন করে দিবেন। শ্রোতাদের একজন জবাব দিলেন, আল্লাহর কসম! আপনার মধ্যে কোন অন্যায় দেখলে আমরা তরবারী দিয়েই সোজা করে দিব।

চ) বিনা অপরাধে শাস্তি না পাওয়ার অধিকারঃ- ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক কেবল নিজ নিজ অপরাধের জন্য শাস্তি ভোগ করবে। কারো অপরাধের দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া কিছুতেই সমিচীন নয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”। (সূরা নজম -৩৮) অপরাধের উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে হয়রানী করা, গ্রেফতার করা, মামলা করা, নির্বাসন দেওয়া কিংবা শাস্তি প্রদান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হে মুমিনগন! যখন কোন ফাসেক তোমাদের নিকট কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তার সত্যতা যাচাই করে দেখ। যেন এমন না হয় যে, না জেনে তোমরা কারো অসুবিধা সৃষ্টি করবে এবং পরে নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবে”। (সূরা হুজুরাত -৬) হাদীস শরীফে এসেছে- “মুসলমান সেই ব্যক্তি যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে”। (বুখারি)

ছ) ইজ্জত সংরক্ষণের অধিকারঃ- ইসলামী রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সম্মানের নিরাপত্তা দিতে দায়বদ্ধ। রাষ্ট্র কোনভাবে কারও মান সম্মানের উপর হস্তক্ষেপ করবে না। যেমন, কারও নাম বিকৃত করে ডাকা, কারও খ্যাতি নষ্ট করা, কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা ইসলামী রাষ্ট্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যপারে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- “হে ঈমানদারগণ তোমাদের এক দল যেন অন্য দলকে নিয়ে হাসি তামাশা না করে, কেননা তারা তামাশাকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে, তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কর না এবং একে অপরকে বিকৃত নামে ডেক না”। (সূরা হুজুরাত-১১) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের ইজ্জত-আব্রæর নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই মান-সম্মানের নিরাপত্তা লাভ মানুষের আইনগত অধিকার।
জ) শিক্ষা লাভের অধিকারঃ- শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে ইসলামের নীতি ও আদর্শ অত্যাধিক দৃঢ় ও বলিষ্ঠ। পবিত্র কুরআনের প্রথম নির্দেশই হলো “পড়”(সূরা আলাক-০১) এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন- জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ। (ইবনে মাযাহ) জ্ঞান অর্জন ব্যাতিত যেমন নাগরিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করাও অসম্ভব। এ কারণে শিক্ষার্জন সম্পর্কিত সুবিধা লাভ একটি নাগরিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সকলেরই শিক্ষার ব্যাপারে সমান অধিকার সুনিশ্চত থাকবে। নারীদের জন্য সহশিক্ষার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে।

০২. রাজনৈতিক অধিকার
ইসলামী রাষ্ট্র বিজ্ঞানের আইনানুযায়ী রাষ্ট্র আল্লাহর খেলাফত এবং প্রত্যেকটি মুসলিম নাগরিক আল্লাহর খলিফা। ইসলামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রত্যেক মুসলিমই সমান অধিকার সম্পন্ন। সকলের পরামর্শের ভিত্তিতে খেলাফত পরিচালিত হবে। সরকার শুধু এক ব্যক্তি, এক পরিবার তথা রাজতন্ত্র অথবা নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠীর হবে না। বরং তা হবে গোটা জাতি থেকে নির্বাচিত। মুসলমানদের পরামর্শ ছাড়া তাদের উপর শাসনকার্য পরিচালনার অধিকার কারো নেই। যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে “তাদের কাজ পারস্পারিক পরামর্শের ভিত্তিতেই স্থীর করতে হবে”। (সূরা আশ-শূরা-৩৮) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে “জরুরী প্রয়োজনে তুমি লোকদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন তুমি সিদ্ধান্তে পৌছাবে তখন আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজ শুরু করবে”। (সূরা আলে-ইমরান-১৫৯) অত্র আয়াত দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, ইসলাম একটি নির্বাচিত পরামর্শ ভিত্তিক সরকার গঠনের নীতিকে অনুমোদন করে।

ক) রাজনৈতিক স্বাধীনতাঃ- ইসলামী রাষ্ট্র নাগরিকদের পরিপূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-“কোন মানুষকে আল্লাহ কিতাব, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং নবুয়াত দান করার পর সে বলবে যে, তোমরা আল্লাহকে পরিহার করে আমার বান্দা হয়ে যাও- এটি সম্ভব নয়। বরং তারা বলবে তোমরা আল্লাহ ওয়ালা হয়ে যাও”। (সূরা আলে ইমরান- ৭৯) রাজনীতিতে গোলামী, স্বৈরতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, একনায়কতন্ত্র, দলিয়করণ ইসলামী আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকারী সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করার অধিকার ইসলামী আইনে স্বীকৃত। এছাড়াও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং ভোট প্রদান করার অধিকার নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলামী রাষ্ট্রে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু গুণ থাকতে হবে, যা প্রচলিত রাজনীতিতে নেই।

খ) আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার লাভের অধিকারঃ- ইসলামী রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই ন্যায়বিচার লাভের অধিকারী। যেহেতু আইনের চোখে সকলেই সমান। রাষ্ট্রের কোন নাগরিক যাতে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা কঠোরভাবে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। যেমন- এরশাদ হয়েছে-“যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার করবে তখন অবশ্যই সুবিচার করবে। (সূরা নিসা- ৫৮) রাষ্ট্রের বিধর্মী নাগরিক এমনকি কোন শত্রæও যদি আদালতে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলে সে তেমন বিচারই পাবে, যেমনটি পায় একজন মিত্র। যেমন- পবিত্র কুরআনে এসেছে-“কোন স¤প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। অতএব তোমরা ন্যায়বিচার কর। কারণ উহা খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী”। (সূরা মায়েদা-৮) চুরির শাস্তি প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “আমার মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে, তবে তাঁর হাত কেটে দেওয়া হবে”। (আবু দাঊদ) স্বাভাবিকভাবে ন্যায়বিচার করার জন্য ইসলামী আইনে উৎসাহিত করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ছাড়া অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেকের জন্য এ অধিকার স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। ধারণামূলক ও অজ্ঞতা প্রসূতভাবে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর অবশ্যই তা ভালোভাবে তদন্ত করে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ ধারণা প্রসূত বেশিরভাগ বিষয় থেকে বিরত থাকো। কেননা অধিকাংশ ধারণাই পাপ”। (সূরা হুজুরাত- ১২)

০৩. অর্থনৈতিক অধিকার
প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্রের যাবতীয় অর্থনৈতিক উপায় উপাদান হতে উপকৃত হবার অধিকারী। এ ব্যপারে রাষ্ট্র কর্তৃক কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ক) সম্পত্তির মালিকানা লাভের অধিকারঃ- সম্পত্তির অধিকার বলতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি লাভের ও উপভোগের স্বাধীনতাকে বুঝায়। ইসলামী আইনে ব্যাক্তিগত সম্পত্তি অর্জন এবং হস্তান্তরের অধিকার স্বীকৃত। সম্পদ অর্জন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- “পুরুষদের জন্য অংশ রয়েছে তাতে, যা তারা উপার্জন করে এবং মেয়েদের অংশ রয়েছে তাতে, যা তারা উপার্জন করে”। (সূরা নিসা- ৩২) প্রত্যেক নাগরিকই বৈধপন্থায় অর্জিত সম্পদের মালিক হবে এবং অপর কোন নাগরিক তার সম্পদ আইনসঙ্গত কারণ ছাড়া হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা – “তোমরা একে অপরের সম্পদ অবৈধ ও বাতিল উপায়ে ভক্ষণ করো না”। (সূরা বাকারা- ১৮৮) অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করা নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ। চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, দালালী, সুদ, ঘুষ প্রভৃতি পন্থায় সম্পদ অর্জন করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্য

ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক শুধুমাত্র অধিকারই ভোগ করে না, তাকে বেশ কিছু দায়ীত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। নাগরিকদের অধিকারের সাথে কর্তব্যও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ক) রাষ্ট্রের আনুগত্য ও অনুসরণঃ- নাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হল রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা। প্রতিটি নাগরিকের প্রথম কর্তব্য হল বৈধ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করা এবং যাবতীয় আইন-কানুন মেনে চলা। রাষ্ট্রীয় আইন পছন্দ হোক আর নাই হোক, সহজসাধ্য হোক বা কঠিন হোক, সর্বাবস্থায় প্রতিটি আইন মেনে চলা নাগরিকদের জন্য অপরিহার্য। কোন আইন ত্রæটিপূর্ণ থাকলে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে তার সমালোচনা বা সংশোধন করার চেষ্টা করা নাগরিকদের কর্তব্য। কিন্তু কষ্টসাধ্য হলেও সংশোধন না করা পর্যন্ত ঐ আইন মেনে চলতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “শ্রবণ করা, অনুসরণ করা, মেনে চলা সু-সময়ে ও অসময়ে এবং আনন্দ ও নিরানন্দে সকল অবস্থাতেই অবশ্য কর্তব্য”। (মুসলিম- ৩৪১৯) রাষ্ট্রের সরকার যদি ইসলামী আইনানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করেন, তবে নাগরিকগণ তার প্রতি আনুগত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাকে সহযোগীতা করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের”। (সূরা নিসা- ৫৯) নেতা বা রাষ্ট্রপ্রধান যদি হাবশী গোলামও হয়, তবুও তার আনুগত্য করতে হবে। যেমন মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন- “যদি এমন হাবশী গোলামও তোমাদের শাসক নিযুক্ত হয়, যার মস্তক হবে শুল্ক আঙুরের ন্যায় (অত্যান্ত কালো), তবুও তোমরা তার সকল আদেশ-নিষেধ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর ও তার অনুসরণ কর”। (বুখারি)

খ) রাষ্ট্রের কল্যাণ কামনা করাঃ- ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু ও কল্যাণকামী। প্রত্যেকেই আন্তরিকতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধশালী একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা পালন করবে। কোন নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করবে না। রাষ্ট্রের মঙ্গল ও কল্যাণের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখবে।

গ) সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহযোগীতাঃ- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য সকল নাগরিক জান-মাল উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকবে। কোন ইসলাম বিরোধী শক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ করলে নাগরিকগণ সম্মিলিতভাবে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তা প্রতিহত করবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা- “তোমরা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ দল বেধে বের হও এবং তোমাদের জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা তা জান”। (সূরা তাওবা- ৪১) রাষ্ট্র রক্ষায় যারা জান-মাল দিতে কুন্ঠাবোধ করে, তাদেরকে পবিত্র কুরআনে “মুনাফিক” বলে অভিহিত করা হয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের উপর হামলা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন- “শান্তি স্থাপনের পর তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না”। (সূরা আরাফ- ৮৫)

এ ছাড়াও নাগরিকগণ রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত সকল প্রকার কর, যাকাত, উশর প্রভৃতি যথাযথভাবে আদায় করবে। কেননা এর সবকিছুই রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যায় হয়ে থাকে।

লেখক
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করেছেন। এখন গবেষণা ও লেখালেখি ও শিক্ষকতা করেন।

Related posts

Top