খুলাফায়ে রাশেদীনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-১

মাসজিদ ই নববী

খুলাফায়ে রাশেদীনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-১

নূরুল ইসলাম আল-আমীন

হযরত আবু বকর রা.-এর খিলাফতকাল

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আবু বকর রা. ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাসূল সা.-এর জন্মের দু’বছর চার মাস পর মক্কা মুকাররমার মিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। তৎকালীন আরবের পাপাচারের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ঘৃণা। জ্ঞানে, বিবেচনাবোধে তিনি সামাজিক মর্যাদায় আসীন ছিলেন। ফলে আরবরা নিজেদের মাঝে সৃষ্ট নানা সমস্যায় আবু বকর রা.কে বিচারক মানতেন। তিনি তরুণ বয়সে (হিলফুল ফুজুল) নামক প্রতিবাদী আন্দোলন সংগঠনের সদস্য ছিলেন।

স্বভাবগত মিল থাকায় মহানবী সা.-এর সাথে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায়ই ব্যবসায়িক সফরে তিনি রাসূল সা.-এর সহযাত্রী হতেন। খাদীজা রা.-এর সাথে রাসূল সা.-এর বৈবাহিক সম্পর্কের নেপথ্যে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল। তিনি আরবের অন্যতম স্বনামধন্য ব্যবসায়ি ছিলেন। খাদিজা রা.-এর পর সর্বপ্রথম তিনিই রাসূল সা.-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ওসমান রা.সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হন। দাওয়াত, জিহাদ ও খিলাফতের গুরু দায়িত্ব পালন শেষে ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। আব্দুলাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের পর আমরা এমন এক কঠিন অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছিলাম যে, যদি আল্লাহ তায়ালা আবু বকর রা.-এর মাধ্যমে আমাদের উপর অনুগ্রহ না করতেন তাহলে আমরা প্রায় ধ্বংসই হয়ে যেতাম’। Von Kremer বলেন, “Of both (Abu Bakr and Omar) it might be truly said without them lslam would have perished with the prophet”.

হযরত আবু বকর রা.-এর মনোনয়ন
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের খবর শুনে চতুর্দিক থেকে লোকজন ছুটে আসছিলেন মসজিদে নববীর দিকে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মুহাজির। কারণ, মুহাজিরদের অধিকাংশের ই এ এলাকায় বসবাস ছিল। কেউ আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন রাসূল সা.-এর কাফন-দাফন নিয়ে। অন্যদিকে বাজার সংলগ্ন ‘সাকীফায়ে বনী সাঈদায়’ ছিল মুসলমানদের আরেক সমাবেশ। এখানে হাতেগোনা দু‘চার জন মুহাজির ছাড়া বাকী সকলেই ছিলেন ‘আনসার’ সাহাবী রা.। তাঁরা সমবেত হয়েছিলেন দীনের মহান ফিকির নিয়ে। তারা উপলব্ধি করছিলেন, রাসূল সা. তো আমাদের থেকে চলে গেলেন। তিনি চলে যাবেন একথা তিনিই আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ও ইসলামী খিলাফত ধরে রাখা এবং সামনে এগিয়ে নেয়া আমাদের দায়িত্ব। আর সেটাকে ধরে রাখতে হলে রাসূল সা.কে দাফন করার পূর্বেই মুসলমানদের পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

ইসলামের মহান দুই নক্ষত্র হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা. উভয়ই ছিলেন মসজিদে নববীতে। হযরত মুগীরা বিন শু‘বা রা. তাদেরকে সংবাদ দিলেন যে, ‘সাকীফায়ে বনী সাঈদায়’ খলিফা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এর এবং সমাধানকল্পে এখনই আপনাদের সেখানে যাওয়া একান্ত আবশ্যক। এ কথা শুনে আবু বকর রা. দাফন-কাফন-এর জন্য অন্যদেরকে নিয়োজিত করে হযরত উমর রা. ও হযরত আবু উবায়দা রা. কে সাথে নিয়ে দ্রæত সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন। এই তিন বুযুর্গ যখন সেখানে পৌঁছলেন, তখন সেখানে রীতিমত গÐগোল শুরু হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সকলের মর্যাদা বজায় রেখে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এক বক্তৃতা দিলেন।

আলোচনা শেষে খলিফা নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব আশা শুরু হলো। খোলা মনে অনেকেই মতামত প্রকাশ করলেন। হুবাব ইবনুল মুনজির রা. বললেন, আমাদের (আনসার) মধ্য থেকে একজন আমীর হবেন এবং মুহাজিরদের মধ্য থেকে একজন আমীর হবেন। হযরত উমর রা. বলেন, আপনাদের অবশ্যই স্মরণ আছে যে, রাসূল সা. মুহাজিরদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, আনসারদের সাথে তোমরা সদ্ব্যবহার করবে। আনসারদেরকে মুহাজিরদের সাথে সদ্ব্যবহার করার উপদেশ দেননি। এতেই প্রমাণিত হয়ে যায় যে, হুকুমত বা খিলাফত মুহাজিরদের হাতে থাকবে।

এভাবে আলোচনার এক পর্যায়ে বাশির ইবনে কা‘ব নামক এক আনসারী বলে উঠলেন, রাসূল সা. কুরাইশ বংশের ছিলেন। সুতরাং তার কওম কুরাইশরাই খিলাফতের সবচেয়ে বেশি হকদার। আমরা মুহাজির ভাইদেরকে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু তার বিনিময় আমরা দুনিয়াতেই নিয়ে নিতে চাই না। আপনারা কি শোনেন নি। নি যে, রাসূল সা. বলেছেন : ‘নেতা কুরাইশদের মধ্য হতে হবে’।

আনসারী সাহাবাদের বেশ কয়েকজন হযরত বাশির রা.-এর কথার তাৎক্ষণিক সমর্থন করে বসলেন। হুবাব ইবনুল মুনজির রা.-এরপরও কিছু বলতে চাইলেও একটা পর্যায়ে সকলেই নিশ্চুপ হয়ে গেলেন এবং সকলেই সুন্দর একটি সমাধানের প্রতীক্ষায় রইলেন।

এক পর্যায়ে নিরবতা ভেঙে সকলের মুরুব্বি হযরত আবু বকর রা. বললেন, এখানে উমর ও আবু উবায়দাহ উপস্থিত আছেন। তোমরা এ দু‘জনের একজনকে খলিফা হিসেবে বেছে নাও। হযরত উবায়দা ও হযরত উমর রা. বললেন, না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. মুহাজিরদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি। তিনি হিজরতের পথে গুহায় রাসূল সা.-এর সঙ্গি ছিলেন, সালাতের ইমামতি করার জন্য রাসূল সা. নিজে তাঁকে প্রতিনিধি বনিয়েছিলেন।

অথচ সালাত হচ্ছে দীনের সবচেয়ে বড় আমল। কাজেই হযরত আবু বকরের বর্তমানে অন্য কোন ব্যক্তি খলিফা হতে পারে না। একথা বলেই হযরত উমর রা. সর্বপ্রথম বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনী তায়েম গোত্রে জন্ম গ্রহণকারী হযরত আবু বকর হিদ্দীক রা.-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন। এর পরপরই হযরত আবু উবায়দা রা. ও হযরত বাশির ইবনে সা‘আদ আনসারী রা. বায়াত গ্রহণ করলেন।

সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে লোকজন বায়াত গ্রহণের জন্য ভেঙে পড়ল। এ খবর বাইরে পৌঁছা মাত্রই লোকেরা বাঁধভাঙা বানের মতো ছুটে আসতে লাগল বায়াত গ্রহণের জন্য। মোটকথা, পরবর্তিতে একে একে তামাম মুহাজির ও আনসারগণ রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের পর তাঁদের একান্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন মানুষ, উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত আবু বকর রা.-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন। এভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল ইসলামের প্রথম খলীফা মনোনয়নের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ এক মুবারক প্রক্রিয়া।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর সময় ইসলামী খিলাফতের বিস্তৃতি
রাসূল সা.-এর ইন্তিকালের পর নব মুসলিম ও মুনাফিকদের মধ্যে ইসলাম বিরোধী নানান ফিতনার উদ্ভব হয়। অনেকে আবার মিথ্যা নবীর দাবী করে বসে। এসময় ইসলামের প্রথম খলিফার প্রধান কাজ হয়ে দাড়ায় এসব ফিতনা নির্মূল করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের মতামত হলো, এ সময় হযরত আবু বকর রা. যদি ফিতনা বন্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিতেন তাহলে ইসলামী খিলাফতের দেদীপ্যমান সূর্য হয়তো চিরতরে নিভে যেত। এসব বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য করে উম্মাহর রাহবার হযরত আবু বকর রা. ফিতনা নির্মূলের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। ফলে তাঁর আমলে নতুন কোন অঞ্চল বিজয় হয়নি; বরং রাসূল সা.-এর যমানায় মক্কা, মাদীনা, ও তায়েফসহ ছোট ছোট আরও যেসব এলাকা নিয়ে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলোই তিনি ধরে রাখেন।

চলবে……………

Related posts

Top