খুলাফায়ে রাশেদীনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-২

খুলাফায়ে রাশেদীনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

হযরত ওমর রা.-এর খিলাফতকাল

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
৫৮০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত কুরাইশ বংশে হযরত উমর রা. জন্মগ্রহন করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সাহসী, রাগী ও তেজী পুরুষ। ইসলামের তীব্র বিরোধী উমর রা. মুহাম্মদ সা. কে খতম করে দিতে নাঙা তলোয়ার নিয়ে বের হয়েছিলেন। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন। সেদিনই তিনি রাসূল সা.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। হিজরতের পর তিনি বহু যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখেন। অতঃপর ইসলামী দুয়িার রাষ্ট্রপ্রতি মনোনীত হয়ে দশ বছর ইসলামের বিজয় কেতন দুনিয়াজুড়ে উড্ডীন করেন। ৬৪৪ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর আবু লুলু নামক মুশরিকের ছুরিকাঘাতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভারত যদি উমর রা.-এর মত কোন নেতা খুঁজে পায় তাহলে ভারতের সকল সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে’।

হযরত উমর রা.-এর মনোনয়ন
হিজরী ১৩ সনের জমাদিউস সানীর শুরুতে হযরত আবু বকর রা. জ্বরে আক্রান্ত হন। একটানা ১৫ দিন তার জ্বর ছিল। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁর হয়তো আর সেরে ওঠা হবে না। তখন তিনি সর্বপ্রথম হযরত আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ রা. কে ডেকে খিলাফত সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। আবু বকর রা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, উমর সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? তিনি বললেন, উমরের মেজাজে কঠোরতা বেশি। উত্তরে আবু বকর রা. বললেন, উমরের কঠোরতার কারণ হচ্ছে, আমি কোমল হৃদয়ের ছিলাম। আমি এটা বুঝতে পেরেছি যে, আমি যে বিষয়ে কোমলতা করতাম তাতে উমরের অভিমত কঠোরতার দিকে যেত। কিন্তু আমি যে সব বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করি উমর সেক্ষেত্রে কোমলতা অবলম্বন করতো। আমার ধারণা, খিলাফত তাঁকে নিশ্চিত রূপেই নরম দিল ও সংযত বানাবে।

এরপর তিনি উসমান রা. ডেকে একই প্রশ্ন করলেন। তিনি জবাব দিলেন, উমরের অন্তর তার বহির্ভাগ অপেক্ষা উত্তম। আপনার পরে আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারবে না। এভাবে হযরত আলী রা. কে ডাকলেন এবং একই প্রশ্ন করলেন। তিনি ঠিক উসমান রা.-এর মতোই উত্তর দিলেন। এখন এলেন হযরত তালহা রা.। আবু বকর রা. নতুন করে বললেন, আমার ইচ্ছা উমরকে মুসলমানদের খলিফা নিযুক্ত করি। তালহা রা. বললেন, আল্লাহ তা‘আলাকে কি জবাব দিবেন যে আপনি প্রজাদের সাথে কি ব্যবহার করেছেন? একথা শুনে তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসিয়ে দাও। তাঁকে বসানো হলো। তিনি বললেন, আমি আল্লাহকে বলবো, আমি তোমার সষ্টজীবের ওপর তোমার সৃষ্টজীবের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে খলিফা নিযুক্ত করেছি। একথা শুনে হযরত তালহা রা. চুপ হয়ে রইলেন।

অতপর তিনি হযরত উসমান রা.কে ওসিয়তনামা লিখতে নির্দেশ দিলেন। রোগের প্রকোপের কারণে হযরত আবু বকর রা. থেমে থেমে কথা বলছিলেন আর হযরত উসমান রা.তা লিখছিলেন। সে ওসিয়তনামা ছিল এরূপ: ‘এটা হচ্ছে সেই চুক্তি যা খলীফাতুর রাসূল সা. আবু বকর তাঁর ইহলৌকিক জীবনের শেষ সময়ে এবং পরলৌকিক জীবনের প্রথম সময়ে করেছি। এমন সময়ে কাফির ব্যক্তিও ঈমান আনায়ন করে এবং কাফির ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে। আমি তোমাদের ওপর উমর ইবনুল খাত্তাবকে নিযুক্ত করেছি এবং তোমাদের মঙ্গল ও কল্যাণ করতে ত্রæটি করিনি। কাজেই উমর যদি সুবিচার ও সবর দ্বারা পরিচালিত হয় তবে তা হবে তাঁর সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার ফল। আর যদি সে অন্যায় ও অবিচার করে তবে আমি তো গায়েব সম্পর্কে অবহিত নই। আমি তো মঙ্গল আর কল্যাণই কামনা করছি। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মফল ভোগ করবে। অর্থাৎ, অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানাতে পারবে তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়’। (সূরা শুরা : ২২৭)

সিদ্দীকে আকবার রা. তাঁর এই সিদ্ধান্ত লিখার পর নিজেই বাইরে এসে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আমি আমার কোন প্রিয় ব্যক্তিকে খলিফা বানাইনি। আমি কেবল নিজের মত অনুসারে উমরকে খলিফা করিনি; বরং বিজ্ঞজনদের পরামর্শ নিয়েছি। এখন তোমরা কি এই ব্যক্তির খলিফা হওয়াতে সন্তুষ্ট? একথা শুনে জনতা বলল, আমরা আপনার নির্বাচন ও আপনার রায় পছন্দ করেছি। অতপর, সিদ্দীকে আকবার রা. বললেন, তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে উমর ফারুকের কথা শোনা ও তার আনুগত্য করা। জনতা ইসলামের প্রথম খলিফার যাবতীয় কথাগুলো অকপটে মেনে নিলো। অতপর তিনি উমর রা. কে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দিলেন।

হযরত উমরে ফারুক রা.-এর সময় ইসলামী খিলাফতের বিস্তৃতি
হযরত উমর রা.-এর শাসনামলে নতুন নতুন অনেক অঞ্চল মুসলমানগণ বিজয় করেন। ফলে জাজিরাতুল আরব সহ বিশাল এক ভূখণ্ডে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় মুসলিম জাহানের সীমানা ছিল, পশ্চিমে : মিশর। পূর্বে ইরাক, ইরান। দক্ষিণে : ইয়েমেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উত্তরে : শাম (ফিলিস্তিন, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া)। উত্তর পূর্বে : আর্মেনিয়া, আজার বাইজান, কিরমান, খোরাসান, বেলুচিস্তান।

 

 

Related posts

Top