নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলজি

ইতিহাসের বিস্ময়কর এক সমরবিদ ও রণকুশলী ছিলেন তুর্কি বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজী। আফগানিস্তানের গরমশীরের অন্তর্গত দাস্ত-ই মার্গের বাসিন্দা এই তুর্কি বংশোদ্ভুত বীর মাত্র ১৭ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে বাংলা জয় করে ইতিহাসে আলোড়ন তুলেছেন। তাঁর এই জয় কেবল ভূখন্ড দখলই ছিলনা, বরং জালেমদের হাত থেকে নিরীহ জনগণকে উদ্ধারের মাধ্যমে তাদেরকে মুক্তি দান করে শ্বাশত আলোকবর্তিকা প্রদর্শনও ছিল।

বখতিয়ারের আগমনের আগে বাংলা অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। সর্বত্রই ছিল বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতার দাপট। ন্যায়, ইনসাফ ছিল একপ্রকার নির্বাসনে। রাজা বল্লাল সেন কর্তৃক বাবা আদম শহীদ রহঃ সহ সাত হাজার সুফি-দরবেশ হত্যার রেশ তখনো জনমানসে তরতাজা। উচ্চবিত্তদের আধিপত্য সর্বত্রই বিশৃঙ্খলার জট পাকিয়ে বসেছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, আশু একটি বিপ্লব সংগঠিত না হলে যেন মানবতাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

গৌড়ের শাসক শশাঙ্ক তার পুরো শাসনামলে তৎকালীন বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ সম্প্রদায় দমনে নিযুক্ত ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন রায়বাহাদুর বলেন, কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের আদেশ ছিল, সেতুবন্ধ হতে হিমগিরি পর্যন্ত যত বৌদ্ধ আছে বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে তাদের হত্যা করবে, যে না করবে তার মৃত্যুদÐ হবে (শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন: প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, পৃ.-১২)। রাজা শশাঙ্কের পর প্রায় চারশ বছর বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল পাল বংশ। পাল রাজাদের পরে এগারো শতকে আবার শাসনক্ষমতায় আসে শশাঙ্কের উত্তরসূরী সেনবংশ। প্রফেসর ড. এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, সেন রাজাগণ ছিলেন গোঁড়া হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী এবং সবসময় ছিলেন নিষ্ঠুর হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় তৎপর। এ সময় বাংলার সামাজিক জীবনে আমলাতন্ত্রের প্রভাব দারুণভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নিষ্ঠুর আধিপত্য। ফলে বৌদ্ধদের কেউবা স্বদেশ পরিত্যাগ করল অথবা নিজ দেশে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের গোলাম বনে গেলেন।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জীবন প্রাণ তখন প্রায় ওষ্ঠাগত। তাদের ধর্ম ও প্যাগোডা অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে। তাদের উপাসনালয় বর্ণহিন্দুদের দখলে চলে যায়। নলিনী নাথ দাশগুপ্ত ‘বাঙ্গালায় বৌদ্ধধর্ম’ বইয়ে লিখেছেন, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরটি একটি পুরাতন বৌদ্ধ মন্দিরের ভিটার উপরই নির্মিত হয়েছে। মন্দির অভ্যন্তরস্থ বিগ্রহদ্বয় বৌদ্ধ তীর্থের অনুকরণ ব্যতীত অন্য কিছু বলে মনে হয় না। এধরণের দৃষ্টান্ত এ অঞ্চলে যথেষ্ট পাওয়া যায়।

বৌদ্ধদের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অন্যায় আচরণ, বিদ্বেষ ও অত্যাচার তাদেরকে ভীষণভাবে শঙ্কিত করেছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে। চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত শূন্যপূরাণ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচার এতই জঘন্য হয়েছিল যে, বৌদ্ধরা থাকত সর্বদা সন্ত্রস্ত। শুধু তাই নয়, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতেও দ্বিধা করেনি। (ভিক্ষু সুনীথানন্দ: বাংলাদেশের বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষু জীবন, পৃ.-৭৭)।

মুসলিম শাসকদের নামে মিথ্যাতথ্য পরিবেশন করে তাদেরকে বিতর্কিতরূপে উত্থাপন করা হালের উগ্র হিন্দুদের অন্যতম কুৎসিত হাতিয়ার। তারই একটি দৃষ্টান্ত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যুতে এ অঞ্চলের মানুষকে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তিদানকারী বখতিয়ার খিলজির বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের মিথ্যা রটনা। আসুন, জেনে নিই এর আদ্যোপান্ত।

নালন্দা মহাবিহার পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সর্বপ্রথম আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি প্রাচীন উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের বিহারের পাটনা থেকে ৮৮ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গড়ে তোলা একটি প্রতিষ্ঠান যা পঞ্চম থেকে খ্রিষ্টীয় শতাব্দির মধ্যে নির্মিত।

এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঠিক সময়কাল নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। বেশির ভাগ ঐতিহাসিকই একমত যে, রাজা কুমারগুপ্তের সময়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা মগধে ৪২৭ সালে নালন্দা প্রতিষ্ঠিত হয়। নালন্দা মূলত বৌদ্ধধর্মের গবেষণা ও ধর্মচর্চার জন্য নির্মিত হলেও সেখানে হিন্দু দর্শন, বেদ, ধর্মতত্ত¡, যুক্তিবিদ্যা, ব্যকরণ, ভাষাতত্ত¡, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনেক বিষয় পড়ানো হতো। এ বিদ্যালয়ে বিদ্যার্জনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তথা তিব্বত, চীন, কোরিয়া, গ্রিস, পার্সিয়া, তুরস্ক থেকে বহু শিক্ষার্থীর সমাগম হতো। ২০০৬ সালে চীন, জাপান ও সিঙ্গাপুরের সহায়তায় মাটিতে চাপা পড়া ধ্বংসস্তুপ থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্ধারের কাজ শুরু হয়। নালন্দাকে উদ্ধারের পর এর ব্যাপ্তি, ভবনগুলোর কাঠামো ও স্থাপত্যশিল্প দেখে পুরো বিশ্ব হতবাক হয়ে যায়। ৮০০ বছর পর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আবারো চালু করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকবার বহি:শত্রæর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খ্রি.) প্রচÐ রকমের বৌদ্ধবিদ্বেষী মিহিরাকুলের নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা। তারা নির্মমভাবে বৌদ্ধ ছাত্র ও ধর্মগুরুদের হত্যা করে। স্কন্দগুপ্ত ও তার পরবর্তী বংশধররা নালন্দাকে পুনর্গঠন করেন। প্রায় দেড় শতাব্দি পরে এটি আবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। আর তা হয় বাংলার শাসক শশাঙ্ক দ্বারা। মুর্শিদাবাদের শাসক শশাঙ্ক রাজা হর্ষবর্ধনের সঙ্গে ধর্মবিশ্বাস বিরোধে লিপ্ত হন। যার ফলে রাজা শশাঙ্ক যখন মগধে প্রবেশ করেন, তখন বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংস করেন। গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিযুক্ত বিভিন্ন বস্তু ধ্বংস করেন। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের সফরনামায় শশাঙ্কের সন্ত্রাসের ইতিহাস ফুটে উঠেছে।

বিভিন্ন বøগ, ওয়েব সাইট, খবরের কাগজ ও সোস্যাল মিডিয়ায় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজির বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ আরোপ করা হয়। তাকে অত্যাচারী, আক্রমণকারী, হিন্দু-বৌদ্ধ নিধনকারী, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ এগুলো সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট, কাল্পনিক, গাঁজাখুরি। বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। পূর্বোক্ত ও পরবর্তী আলোচনায় এটি স্পষ্ট হবে। মানুষ লুণ্ঠন করে স্বর্ণ, রৌপ্য, অর্থকড়ি, টাকাপয়সা। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব মূল্যবান ও দামি সম্পদ থাকার কথা নয়। তাই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বা ওদন্তপুরি বিহার লুণ্ঠন করার প্রশ্নই আসেনা।

দ্বাদশ শতকে তুর্কি এক অভিযানের সময় নালন্দা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। (দৈনিক প্রথম আলো, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, বিবিসি বাংলা পহেলা সেপ্টেম্বর ২০১৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া)। বখতিয়ার খলজি ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রথম আলো, বিবিসি, বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়ার কেন এই মিথ্যাচার? এমনকি ভারতের রাজ্যসভায়ও ২০১৪ সালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সভায় কংগ্রেস সদস্য করণ সিং ও সিপিএম সদস্য সীতারাম ইয়েচুরির মধ্যে নালন্দা বিলুপ্তি নিয়ে বাহাস হয়। করণ সিং অধিবেশনে বখতিয়ার খলজি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেন উল্লেখ করে তাকে বর্বর আখ্যা দেন। দুঃখের বিষয়, ইতিহাস এখন ঐতিহাসিক একাডেমিনিসিয়ানদের হাত থেকে রাহাজান হয়ে মতলববাজ রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও হলুদ সাংবাদিকদের দখলে চলে গেছে। এ জন্যই দুনিয়াজুড়ে এত অশান্তি, বিপর্যয়।

দুর্মুখেরা মিনহাজ-উস-সিরাজের তাবাকাত-ই নাসিরির সূত্রে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের তথ্যটি পেশ করে থাকেন। কিন্তু মিনহাজের বয়ানে এধরণের কোনো তথ্য নেই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও কথাসাহিত্যিক, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় মিনহাজের বিবরণী ‘বাংলার ইতিহাস’ শীর্ষক বইয়ে এভাবে অনুবাদ করেছেন (সুখময় মুখোপাধ্যায়; বাংলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৩-৬)। ঐতিহাসিক মিনহাজের বর্ণনায় বিহার ও নদীয়া জয়ের কাহিনী পাওয়া যায়। নালন্দা অভিযান , নালন্দা জয়, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের কোন তথ্য বা ঘটনা এতে পাওয়া যায়না। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আবদুল করীম ও এতে একমত। এ দুজন গবেষকই বখতিয়ার খলজির উপর ব্যাপক গবেষণা করেছেন (আবদুল করীম; বাংলার ইতিহাস ও সুলতানি আমল, পৃ. ৮০-৯০, বাংলার ইতিহাস; মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব, পৃ. ১৫-২২ এবং সুখময় মুখোপাধ্যায়: বাংলার ইতিহাস, পৃ. ৩-২৪)। তাছাড়া শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলাদেশের ইতিহাস বইয়ে (পৃ. ১০২-১০৬) মিনহাজের তাওয়ারিখ ও বখতিয়ার সংক্রান্ত তথ্যাবলির বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। এ তিন বরেণ্য মনীষী তাদের কোনো ইতিহাস গ্রন্থে বখতিয়ারের নালন্দায় অভিযানের কোনো সত্যতা পাননি। আর সি মজুমদার বলেছেন, বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা জয় সম্বন্ধে যত কাহিনী ও মতবাদ প্রচলিত আছে, তা মিনহাজের বিবরণের উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ, এ সম্বন্ধে অন্য কোনো সমসাময়িক ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নাই (শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস, পৃ. ১০৪)। পরবর্তীকালের আরো তাওয়ারিখ তথা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ইসামি রচিত ফুতুহ-উস-সালাতিন এবং হাসান নিজামি রচিত তাজ-উল-মাসিরেও নালন্দা অভিযানের কোনো ঘটনা নেই। তারপরও বখতিয়ার বিদ্বেষীরা কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তুর্কি মুজাহিদদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।

উদন্তপুরী বিহারের বিষয়টি আলাদা। সেখানে শত্রæ সৈন্যদের দুর্গ মনে করে ভুলবশত খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। মুয়াররিখ মিনহাজের বিবরণে জানা যায়, বখতিয়ার দুর্গ আক্রমণ করেন। এ জায়গার বেশিরভাগ বাসিন্দা ছিল ন্যাড়া মাথার। ড. আবদুল করীম ও সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে, এটি ছিল একটি বৌদ্ধ বিহার। যার উদন্তপুর (আবদুল করীম: বাংলার ইতিহাস; সুলতানি আমল, পৃ. ৮২ এবং সুখময় বন্দোপাধ্যায়: বাংলার ইতিহাস, পৃ. ৪)। তবে ড. দীনেশচন্দ্র সরকার দেখিয়েছেন, উদন্তপুর বৌদ্ধবিহার ধ্বংস হয় ১১৯৩ সালে। এ ছাড়া আরো অনেক গবেষক বলেছেন, উদন্তপুর ধ্বংস হয় ১১৯১-৯৩ সালের সময়কালে। অথচ সুখময় মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, বখতিয়ার বিহার বিজয় করেন ১২০৪ সালে (সুখময় মুখোপাধ্যায়: বাংলার ইতিহাস, পৃ.২৪)। তাই বখতিয়ার কর্তৃক উদন্তপুর বিহার ধ্বংসের কাহিনীও নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। অন্য কেউ সেটা ধ্বংস করতে পারে বা দৈব দুর্বিপাকেও পরিত্যক্ত হতে পারে। তাছাড়া সেটা কোনো স্বর্ণভান্ডার বা গুপ্তধনকেন্দ্র নয় যে, সেখানে লুটতরাজ চালাতে হবে। তাছাড়া বই বিনষ্টের ঘটনাও নির্ভরযোগ্য নয়। আবার কোনো কোনো গবেষক প্রমাণ করেছেন, সেন রাজাদের হিন্দুত্ববাদী গুপ্তচরেরা তুর্কি বাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে উদন্তপুরিতে আক্রমণে প্ররোচিত করে।

এতদ্ব্যতীত মুয়াররিখ গোলাম হোসেন সেলিম, চার্লস স্টুয়ার্ট, ড. এম আবদুল কাদের, ড. এম এ রহীম, ড. এ কে এম শাহনেওয়াজ, সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, আবদুল জাব্বার, মোহাম্মাদ হান্নান, মোহাম্মাদ আবদুল মান্নান, সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদ, ড. মোহাম্মাদ আবদুর রহীম, মোহর আলী, ড. মমিন চৌধুরী, ড. এ বি এম মাহমুদ, ড. সিরাজুল ইসলাম, সিরাজ উদ্দীন আহমদ, ড. এ কে এম মুহসীন, ড. আসকার ইবনে শাইখ, ড. এম এ আজীজ, এম আর আখতার মুকুল, জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ গবেষক বা ঐতিহাসিকরাও কেউ বখতিয়ারের বিরুদ্ধে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় অভিযানের সত্যতা পাননি।

তারপরও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার গ্রন্থরাজি পোড়ানোর কাল্পনিক অভিযোগ কেন দাঁড় করানো হয় বখতিয়ার খলজির বিরুদ্ধে? প্রকৃতপক্ষে এটা হিন্দুত্ববাদী কারসাজি। মুসলমানদের সন্ত্রাসী জঙ্গি বানানোর অতি প্রাচীন নীতিকে তারা আজও লালন করছে। একই সাথে তাদের শঠতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার, বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। এই কাজে কারা জড়িত বা কারা এরূপ নিধনপ্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত নিচের আলোচনা থেকে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হওয়া যাবে।

ইসলাম বরাবর সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ধ্বংসযজ্ঞের বিপক্ষে। নামজাদা বুদ্ধিজীবী গোপাল হালদার বলেছেন, হিন্দুধর্মের পরিবেশ ভারতবর্ষ। তাই এ ধর্মকে সত্যই ভারতধর্মও বলা চলে। এ দেশের নদ-নদী, গিরি-পর্বত, আহার্য ও পানীয় এবং ইতিহাসের উপলব্ধিই হলো হিন্দুধর্মের দেহ ও প্রাণ। ইসলাম দেশগত বা জাতিগত ধর্ম নয়, তা সব মানুষের একমাত্র ধর্ম হইবার স্পর্ধা রাখে। …ইসলাম কোনো জাতির ধর্ম নয়, প্রচারশীল ধর্ম। উহা অন্যকে জয় করিয়াই ক্ষান্ত হয় না। কোলে টানিয়া লয়। তাই ইসলামের বিজাতীয় ও বিজেতা প্রচারকের দল ভারতের জনগণকে বিন্দুমাত্রও অবজ্ঞা করিল না (গোপাল হালদার: সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃ. ১৮০-১৮১)। ইসলামী নীতিতে সব মানুষ সুষম অধিকার ভোগ করবে। সেখানে বেইনসাফির সুযোগ নেই।

আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন বৌদ্ধদের প্রতি হিন্দুদের অনেক অত্যাচারের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বৃহৎবঙ্গ প্রথম খÐ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, হিন্দুরা শুধু বৌদ্ধদের অত্যাচার ও তাদের ধর্ম নষ্ট করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা এতকালের সঞ্চিত বৌদ্ধ ভান্ডার সর্বৈব লুণ্ঠন করে লুণ্ঠিত দ্রব্যাদির উপর স্বীয় নামাঙ্কের ছাপ দিয়ে সামগ্রিকভাবে সর্ববিধ নিজস্ব করে নিয়েছন। হিন্দুদের পরবর্তী ন্যায়, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদির মধ্যে এ লুণ্ঠন পরিচয় পাওয়া যায়। এভাবে হিন্দুগণ কর্র্তৃক বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যময় ইতিহাস বিলোপ প্রাপ্ত হয়েছে। এর জন্য হিন্দুগণই একমাত্র দায়ী। ভিক্ষু সুনীথানন্দ তার রচিত বাংলাদেশের বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষু জীবন গ্রন্থের ৭৮ নং পৃষ্ঠায় বলেন, “হিন্দুরাই বৌদ্ধকীর্তি ধ্বংসের নায়ক”। তারপরও আজ হিন্দু-বৌদ্ধ মিলে বখতিয়ারকে দোষারোপ করছে। যিনি বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন, উপকারভোগীরা তাকেই আজ খলনায়ক বানাতে ব্যতিব্যস্ত।

বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক মানবেন্দ্র নাথ রায় বলেন, হিন্দুত্ববাদী প্রতিক্রিয়ায় বৌদ্ধ বিপ্লব যখন পর্যুদস্ত হয়ে গেল আর তাতেই হলো ভারতের সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলার উৎপত্তি; তখন অগণিত জনসাধারণ তা থেকে স্বস্তি ও মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচার জন্য ইসলামের বার্তাকেই জানালো সাদর সম্ভাষণ (এমএন রায়: ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান, পৃ. ৮৬-৮৭)। ইসলাম চিরদিন জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকাশের পক্ষে। আল কুরআনে প্রথম আহবান ইকরা বা পড়। দুনিয়ার সব মহামানবদের মধ্যে ইলম অর্জনকে বা লেখাপড়াকে সর্বাপেক্ষা বেশি উৎসাহিত করেছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাঃ। তাই তার উত্তরাধিকারের পক্ষে বই-পুস্তক পোড়ানো বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো অসম্ভব ব্যাপার। ব্রিটিশ সিভিলিয়ান এফ বি ব্রাডলি বার্ট বলেন, “প্রাচীন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পূর্ব বাংলার প্রাথমিক যুগও রহস্যের দুর্ভেদ্য অবগুণ্ঠনে আবৃত। মুসলীম অভিযানের পূর্ববর্তী সময়ের যা কিছু জানা যায়, তা উপাখ্যান ও লোককাহিনী মাত্র। মুসলমানদের আগে এদেশে বৌদ্ধ ও হিন্দুরা বাস করতো। তারা ইতিহাস লিখতে জানত না। বংশপঞ্জি সঙ্কলনের মধ্যেই তাদের সাহিত্য নৈপূণ্য সীমাবদ্ধ ছিল বলে মনে হয়। দেশের স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি তারা লিপিবদ্ধ করত না। —কেউ যদি তা করতো, তবে নিশ্চয়ই তার লিখিত কাগজপত্রসুদ্ধ তাকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা হতো। (এফ বি ব্রাডলি বার্ট: প্রাচ্যের রহস্য নগরী, পৃ. ১৭-১৮)।

বাংলাদেশের আদিম জনসাধারণকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-ইতিহাস-দর্শন-চিকিৎসা শিক্ষা দিয়েছেই মুসলমান উস্তাদরা। এখানে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ বিবেচনায় আনা হয়নি। ভয়ঙ্কর উগ্র মুসলিম বিরোধী ই বি হ্যাভেল নিতান্ত অনিচ্ছা সত্তে¡ও ‘এরিয়ান রুল ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে স্বীকার করেছেন, মুসলমানদের রাজনৈতিক মতবাদ শুদ্রকে দিয়েছে মুক্ত মানুষের অধিকার, আর উপরতলার হিন্দুত্ববাদীদের উপরেও প্রভুত্ব করার ক্ষমতা। ইউরোপের পুনর্জাগরণের মতো চিন্তাজগতে এও তুলেছে তরঙ্গাভিঘাত, জন্ম দিয়েছে অগণিত দৃঢ় মানুষের আর অনেক অত্যদ্বূত মৌলিক প্রতিভার। পুনর্জাগরণের মতোই এও ছিল আসলে এক পৌড় আদর্শ। —এরই ফলে গড়ে উঠল বাঁচার আনন্দে পরিপূর্ণ এক বিরাট মানবতা (এমএন রায়: ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান, পৃ. ৮৭-৮৮)।

বখতিয়ারের বাংলা জয় কোনো উপনিবেশবাদী বিপ্লব ছিল না। তিনি এদেশে এসেছেন, এদেশের সমৃদ্ধির জন্যই কাজ করেছেন। মৃত্যু অবদি ছিলেন এদেশের মানুষের সাথে। তাঁর বিজয়গুলো ছিল আমজনতার গণবিপ্লব।

 

মুহাম্মাদ আবদুল ওহাব

Related posts

Top