মাকাসিদে শরীয়াহ

মাকাসিদ আশ শরীয়াহ

মাকাসিদে শরীয়াহ

মুফতি আব্দুর রহমান গিলমান

‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ শিরোনামটিতে দু’টি শব্দ রয়েছে। একটি হচ্ছে মাকাসিদ, যা ‘মাকসাদ’ শব্দের বহুবচন। আরবিতে ‘মাকসাদ’ শব্দটির একাধিক আভিধানিক অর্থ রয়েছে, তন্মধ্যে প্রধানতম অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য । আরেকটি শব্দ হচ্ছে শারীয়াহ্।

শারীয়াহ্ এর সংজ্ঞা :
‘শারীয়াহ্’ একটি আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ দীন, ধর্ম, জীবন-পদ্ধতি, নিয়ম-নীতি ইত্যাদি । তবে আরবী ভাষায় শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হল- পানির উৎসস্থল বা যে স্থান থেকে পানি উৎসারিত হয়ে গড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ সেখানে এসে পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করে ।

পরিভাষায় শারীয়াহ্ এর সংজ্ঞায় ইমাম ইবনু তাইমিইয়াহ বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা যে সব আকীদা ও আমল মানুষের জন্য প্রণয়ন করেছেন, তা-ই শারীয়াহ্’ । অন্যত্র তিনি বলেছেন, শারীয়াহ্ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উলুল আমর (তথা মুসলিম প্রশাসক ও আমীর) এর আনুগত্য করা’ ।

ইসলামী শারীয়াহ্ এর সংজ্ঞা আরো সহজভাবে আমরা এভাবে দিতে পারি, “মহান আল্লাহ তা‘আলা জীবন ও জগত পরিচালনার জন্য রাস‚ল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে স্বীয় বান্দাদেরকে যে সার্বিক হুকুম ও বিধান প্রদান করেছেন, তা-ই হল ইসলামী শারীয়াহ্’’। ‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ ইসলামী আইন বিষয়ক জ্ঞনের একটি সমৃদ্ধ শাখা, যা স্বয়ং সম্প‚র্ণ একটি শাস্ত্র হিসাবে আজ মুসলিম বিশ্বেও বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়সম‚হে পঠিত হচ্ছে।

‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা
পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতগণ ‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ এর কোন সুষ্পষ্ট পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করেন নি, যদিও বিষয়টি তাদের অনেকেরই জানা ছিল। তারা ‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ এর নানা বিষয় যেমন হিকমাত বা প্রজ্ঞা, ইল্লাত বা কার্যকারণ, মাসালিহ বা কল্যাণ এবং মাফাসিদ বা অকল্যাণ প্রভৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে আলোচনা করেছেন।

শারীয়াহ্ এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা ‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ এর প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে মুসলিম পন্ডিতগণ ইসলামী জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখার সংজ্ঞা প্রদানে ব্রতী হন। তারই অংশ হিসেবে ‘মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’ এর একাধিক সংজ্ঞা তারা দিয়েছেন। নিম্নে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা দেয়া হলো।

তিউনিসিয়ার প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত মুহাম্মাদ তাহির ইবনু ‘আশুর বলেন, “ব্যাপকার্থে মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্ হচ্ছে সে সব উদ্দেশ্য ও হিকমাত, শরীয়াহ্ এর সকল কিংবা অধিকাংশ হুকুমের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ যেগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন’’ ।

প্রফেসর ড. আহমাদ রাইসুনী বলেন, “সকল বান্দার কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে যে সব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শরীয়াহ্ প্রণয়ন করা হয়েছে তা-ই হল মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্’’।

ড. মুহাম্মাদ সা‘দ আল-ইয়ুবী মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্ এর সংজ্ঞায় বলেন, “মাকাসিদ হচ্ছে সে সকল উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও হিকমাত, শরীয়াহ্ প্রণয়নের সময় সকল বান্দার কল্যাণ সাধনের জন্য সাধারণভাবে ও বিশেষভাবে যেগুলোর প্রতি আল্লাহ লক্ষ্য রেখেছেন’’।

এ সংজ্ঞাগুলো খুবই কাছাকাছি। এগুলোর আলোকে সংক্ষেপে বলা যায় যে, মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্ হচ্ছে সে সকল মাসালিহ ও কল্যাণমুখী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সমষ্টি, শরয়ী হুকুম মেনে চলার মাধ্যমে বান্দাদের জন্য যা অর্জিত হওয়ার ইচ্ছা আল্লাহ করে থাকেন।

শরীয়াহর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইবনুল কাইয়েম বলেন, “শরীয়াহর ভিত্তি হচ্ছে মানুষের প্রজ্ঞা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে জনগণের কল্যাণ সাধন। আর কল্যাণ নিহিত রয়েছে সার্বিক আদল (ন্যায়বিচার), দয়া-মমতা, কল্যাণকামিতা ও প্রজ্ঞার মধ্যে। যেখানে আদলের পরিবর্তে জুলুম, দয়া-মমতার পরিবর্তে নিষ্ঠুরতা, কল্যাণকামিতার পরিবর্তে দুঃখ-দুর্দশা এবং প্রজ্ঞার পরিবর্তে নির্বুদ্ধিতা বা বোকামি স্থান পায়, তার সাথে শরীয়াহ কোনো সম্পর্ক নেই।’

মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ এর প্রকারভেদ
ইমাম শাতেবী রহ. শরীয়াহর উদ্দেশ্যকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন।
-মানব জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপ‚র্ণ বিষয়সম‚হ (আজ-জারুরিয়্যাত)
-মানব জীবনের প্রয়োজনসম‚হ (আল-হাজিয়্যাত)
-মানব জীবনের শোভাবর্ধনকারী বিষয়সমুহ (আত-তাহসীনীয়্যাত)

মাকাসিদ আশ্-শারীয়াহ্ এর দৃষ্টিতে মানব জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপুর্ণ বিষয়সমুহ (আজ্-জারুরিয়্যাত)

‘আজ-জারুরিয়্যাত’ এর সংজ্ঞাঃ
ইমাম শাতিবী রহ্. এর সংজ্ঞায় বলেন, “আজ-জারুরিয়্যাত হচ্ছে দীন ও দুনিয়ার সে সকল অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সম‚হ যার অনুপস্থিতিতে দুনিয়ার কল্যাণের সঠিক গতিধারা ব্যাহত হয়, বরং এ ক্ষেত্রে দেখা দেয় বিপর্যয়, সীমাহীন ক্ষতি ও প্রাণ হারানোর ঘটনা। আর আখিরাতে নাজাত ও নেয়ামত লাভ হয় সুদ‚র পরাহত এবং সুস্পষ্ট ক্ষতিতে লিপ্ত হওয়া হয়ে ওঠে অবধারিত’’ ।
প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত আল-মুহাল্লী বলেন, “যে সব বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা জরুরী পর্যায়ে পড়ে, সেগুলোই হচ্ছে আজ-জারুরিয়্যাত’’।

‘আজ-জারুরিয়্যাত’এর বিষয়সমূহ:
‘আজ-জারুরিয়্যাত’ পাঁচটি । সেগুলো হল :
১. দীনের হেফাযত
২. জীবনের হেফাযত
৩. আকল বা বিবেকের হেফাযত
৪. বংশধারা ও ইজ্জতের হেফাযত
৫.সম্পদের হেফাযত

এ পাঁচটি বিষয়কে বলা হয় আল-মাকাসিদ আল-খামসাহ্ বা শারীয়াহ্-এর পাঁচটি উদ্দেশ্য।

মানবজীবনের প্রয়োজনসমূহ (আল-হাজিয়্যাত):
ইমাম শাতিবী রহ্ এর সংজ্ঞায় বলেন,‘তা হল সে সকল বিষয়, মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ আনয়নের জন্য এবং কঠোরতা, সমস্যা ও অসুবিধা দূরীভ‚ত করার জন্য যা প্রয়োজন। এ বিষয়গুলোর প্রতি যদি বিশেষ নজর দেয়া না হয় তাহলে সাধারণভাবে বান্দার উপর সমস্যা ও অসুবিধা আরোপিত হয়, তবে তা জনকল্যাণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিপর্যয় সৃষ্টির পর্যায়ে পড়ে না’ ।

আল-হাজিয়্যাত এর হেফাযতের জন্য ইসলামী শারীয়াহ্ নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করেছেঃ
-ইবাদাতের ক্ষেত্রে উদ্ভ‚ত অসুবিধাসম‚হ উঠিয়ে নিয়েছে, যা সচরাচর মানুষের পক্ষে মানিয়ে নেয়া কষ্টকর।
-অসুস্থ ও মুসাফির ব্যক্তির জন্য রমযানে সাওম ভঙ্গের রুখসাত ও অনুমতি।
-মুসাফির ব্যক্তির জন্য সফরে কসর সালাত আদায়ের বিধান।
-অন্ন, বস্ত্র ও সংস্থান হিসাবে নানা প্রকার অসংখ্য পবিত্র বস্তু ব্যবহার বৈধ হয়া।
-মুয়ামিলাতের ক্ষেত্রে ইজারাহ, বাই’ সালাম, মুদারাবাহ প্রভৃতি ব্যবসায় পদ্ধতি জায়েয হওয়া।

জীবনের শোভাবর্ধনকারী বিষয়সম‚হ (তাহ্সিনিয়্যাত) :
ইমাম শাতিবী রহ. এর সংজ্ঞায় বলেন, ‘যা উত্তম বলে বিবেচিত তা গ্রহণ করা এবং সুস্থ সবল বিবেক ঘৃণা করে এমন সব নিকৃষ্ট জিনিস পরিহার করা’’ ।

Top