মানুষ সম্পর্কে সুধারণা রাখুন

গোয়েন্দাগিরি

মানুষ সম্পর্কে সুধারণা রাখুন

কারো প্রতি খারাপ ধারণা, কারো পেছনে লেগে থাকা, দোষ খোঁজা ও বিদ্বেষ পোষণ করার মতো ব্যাধি সামাজিক অশান্তির কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভিত্তিহীন ধারণা-অনুমান সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ধারণাবশত মানুষ যেসব কাজ করে বসে, তা থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন—
ধারণা-অনুমান সম্পর্কে তোমরা সাবধান হও। কারণ অলীক ধারণা পোষণ সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা পরস্পর গোয়েন্দাগিরি করো না, ঝগড়া-বিবাদ করো না, অসাক্ষাতে দোষচর্চা করো না, হিংসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করো না। আল্লাহর বান্দারা, সবাই ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৬)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা অধিক পরিমাণ ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা কিছু কিছু ধারণা পাপতুল্য। তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি কোরো না এবং পরস্পরের নিন্দা কোরো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

যেসব ধারণা মিথ্যা হিসেবে গণ্য

আল্লাহর রাসুল (সা.) এ বিষয়ে (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের সেসব অসওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা তাদের মনে উদিত হয় বা যেসব কথা মনে মনে বলে থাকে; যতক্ষণ না তা বাস্তবে করে বা সে সম্পর্কে কথা বলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬৬৪)

ইমাম খাত্তাবি (রহ.) বলেন, উদ্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য দোষণীয়, অপবাদের পর্যায়ে পড়ে এবং যে ধারণার কোনো ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও তা অন্তরে পোষণ করা হয়— সেসব ধারণা থেকে নিষেধ করা হয়েছে এখানে। নতুবা প্রাথমিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

খারাপ ধারণা মুমিনের অপছন্দনীয়
অন্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা মুমিন করে না। এটা মুমিনের জন্য অপছন্দনীয়ও বটে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মনের মধ্যে এমন কিছু চিন্তার উদ্রেক হয়, যা সূর্য উদিত হওয়ার পরিধির মধ্যকার (মূল্যবান) সব কিছুর বিনিময়েও প্রকাশ করা আমরা সমীচীন মনে করি না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি তা অনুভব করো? তারা বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, এটিই ঈমানের সুস্পষ্ট পরিচয়।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩)

দোষ গোপন রাখায় আছে পুরস্কার : মানুষের দোষ গোপন রাখা মহৎ কাজ। দোষ-ত্রুটি প্রকাশের ফলে ব্যক্তি সানন্দে জীবনযাপন করতে পারে না। চলাফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পৃথিবী তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। মানুষের কল্যাণার্থে মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা দোষ-ত্রুটি গোপনকারীর দোষ গোপন করেন। তাকে উভয় জগতে পুরস্কৃত করেন। মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৪৫)

দোষ অনুসন্ধানকারীর শাস্তি ভয়াবহ 

পরের দোষ খোঁজা নিন্দনীয়। কোনো গোপনীয় সভা কিংবা দলের পেছনে অকারণে গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করা গুনাহ। মানুষের অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি যদি তাদের কথা শোনে; গোয়েন্দাগিরি করে তাহলে তার জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কথা গুপ্তভাবে শুনল; অথচ সে তাদের কথাগুলো শুনুক তারা তা পছন্দ করছে না অথবা তারা তার অবস্থান টের পেয়ে তার থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে, কিয়ামতের দিন এ জন্য তার কানে সিসা ঢেলে দেওয়া হবে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৪২)

আরেকটি হাদিসে কথাটি আরো সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, ‘হে লোকেরা, তোমরা যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ; অথচ ঈমান তোমাদের অন্তরে ঢোকেনি, তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দিয়ো না। তাদের দোষ অনুসন্ধান করো না। কারণ যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করল, আল্লাহ তাআলা তার দোষ অনুসন্ধান করবেন। আর যার দোষ আল্লাহতায়ালা অনুসন্ধান করবেন তাকে অবশ্যই তিনি লাঞ্ছিত করে ছাড়বেন, যদিও সে নিজ ঘরের অভ্যন্তরেই অবস্থান করুক না কেন। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০৩২)

অপ্রয়োজনে গোয়েন্দাগিরি নিষেধ

রাষ্ট্র বিনা কারণে কারো দোষ অনুসন্ধান করলে, ব্যক্তির বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। তবে কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে, তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা যাবে। জায়িদ ইবনে ওয়াহব (রহ.) বলেন, ‘একবার এক ব্যক্তিকে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে এনে বলা হলো, এই সেই লোক, যার দাড়ি থেকে মদ টপকে পড়ছে। ’ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমাদের জন্য গোয়েন্দাগিরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু যদি প্রকাশ্যে কোনো অন্যায় আমাদের সামনে ধরা পড়ে, তাহলে এর জন্য আমরা তাকে ধরব। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৯০)

Top