রোজার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

রোজার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

শেখ ফজলুল করীম মারুফ

রোজা ইসলামের প্রধান পাঁচটি আমলের একটি। যার লক্ষ্য কোরআনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” এই আয়াতে পরিষ্কার করা হয়েছে, রোজার প্রধান লক্ষ্য হল তাকওয়া অর্জন করা। তাকওয়া একটি আরবী শব্দ। যার অর্থ; বিরত থাকা, বেঁচে থাকা, ভয় করা, নিজেকে রক্ষা করা। ব্যবহারিক অর্থে; আল্লাহ তা‘লার ভয়ে যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকাকে তাকওয়া বলা হয়। বা সকল প্রকার পাপাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করাকে তাকওয়া বলা হয়।

তাকওয়া একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু তার প্রভাব ব্যক্তির ওপরে খুবই দৃশ্যমান। তাকওয়া ব্যক্তির ওপরে এতটা প্রভাব ফেলে; যেকোনো মুত্তাকিকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। কারণ ব্যক্তির বিশ্বাস, দৈনন্দিন কার্যক্রম, মানুষের সাথে ব্যবহার, সমাজ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি সবকিছুই তাকওয়ার কারণে ভিন্ন রকম হয়।

মানুষ-সমাজ-রাজনীতি একে অন্যের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। এর কোন একটাতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসলে তা অন্যকে প্রভাবিত করে। বিশেষত মানুষ; মানুষের চিন্তা, আচরণ ও কর্মের প্রভাবে সমাজ-রাজনীতি বদলে যাবেই; এটা চিরন্তন সত্য। একারণেই ব্যক্তির মধ্যে তাকওয়া অর্জিত হলে সমাজ ও রাজনীতিতেও তার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে।
যদি কোন সমাজে বা রাজনীতিতে তাকওয়ার প্রভাব দেখা না যায় তাহলে এর অর্থ হল; হয়তো সেখানকার মানুষের মাঝে তাকওয়া অর্জিত হয় নাই অথবা সেখানকার মানুষ সমাজ-রাজনীতিতে সম্পূর্ণ প্রভাবহীন। সেই সমাজ-রাজনীতি জনতার বাইরে অন্যকোনো অশুভ শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার সিংহভাগই মুসলিম। এখানে রোজা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উৎসবমুখর অবস্থায় উদযাপিত হয়। রমজান মাসে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এখানে রোজা না রাখাটা সামাজিকভাবে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। দৃশ্যত এমন রোজা ঘনিষ্ঠ সমাজে রোজার প্রধান লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন হয়; এটা ধরে নেয়ায় যুক্তিযুক্ত। এখন বিশ্লেষণ করার বিষয় হলো, ব্যক্তিপর্যায়ে অর্জিত সেই তাকওয়ার প্রভাব সমাজ-রাজনীতিতে পড়েছ কিনা?

সমাজ ও রাজনীতিতে রমজানের প্রভাব বোঝার আগে তাকওয়ার শ্রেণীবিন্যাস করে নিলে খানিকটা সুবিধা হবে।
তাকওয়ার তিনটি স্তর। ১. সকল ধরনের শিরিক ও কুফুরি থেকে বেঁচে থাকা। ২. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক অপছন্দনীয় যাবতীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। ৩. অন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। তাকওয়ার এই তিনটি স্তর থেকে প্রথম দুটি স্তর জনসাধারণের জন্য বলে ধরে নেওয়া যায়। এর প্রেক্ষিতে সমাজ-রাজনীতিতে তাকওয়ার যে প্রভাব প্রত্যাশা করা যায় সেগুলো হলো,

শিরিক মুক্ত হওয়া
শিরিক হলো, আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা। এটা দুইভাবে হতে পারে। আল্লাহর জাত বা সত্বার সাথে শরিক করা বা আল্লাহর সিফাত বা গুনাবলীর সাথে অংশীদারিত্ব সাব্যস্ত করা। কোন মুসলমান সাধারণত আল্লাহর জাতের সাথে শরীক করে না। কিন্তু না-জানা, ভুল জানা বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর সাথে শরীক করে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে মুসলমানদের মাঝে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শিরিকের ব্যাপকতা লক্ষণীয়। ইসলাম সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে একমাত্র আল্লাহকেই মান্য করে। তাকেই সকল ক্ষমতার উৎস মনে করা হয়। তার আইনের সার্বভৌমত্বে স্বীকার করা হয়। কোন অবস্থাতেই তার দেয়া আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ এখানে থাকে না। তার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এমন কোন মতবাদ ও বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করতে ইসলাম আদেশ দেয়। কিন্তু আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রচলিত মতবাদগুলোতে জনগণকেই সকল ক্ষমতার উৎস মনে করা হয়।

আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে সার্বভৌম মনে করা বা অন্য কোনো শক্তিকে সকল ক্ষমতার উৎস মনে করা সুস্পষ্ট শিরিক। এমন করা ব্যক্তি মুসলিম থাকবে না। অথচ আধুনিক জাতি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রকে সার্বভৌমত্ব মনে করা এবং জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস মনে করা রাজনৈতিক দল ও মতবাদগুলো বহুল প্রচলিত। কোটি কোটি মুসলিম এই কাজগুলো করছে। এমনকি তারা “জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস” নীতি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করছে এবং এই নীতির প্রতিফলন হিসেবে শরিয়াহ বিরোধী আইনও পাশ করছে। সামগ্রিক বিবেচনায় এমন কাজে লিপ্ত মানুষদের মুশরিক আখ্যা দেওয়া না হলেও এখানে শিরিকের উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট। বাংলাদেশে মহাউৎসাহে রমজান পালিত হলেও তাকওয়ার একেবারে প্রাথমিক স্তরও এখানে অর্জিত হয়েছে বলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রমানিত না। ফলে আল্লাহর আইনের বাইরে অন্যকোন কিছুকে আইনের উৎস বিবেচনা করে বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে এমন মতবাদ ও দলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা তাকওয়ার একেবারে প্রাথমিক দাবী। আসন্ন রমজানে এই বিষয়ে সকল মুসলমানদের সতর্ক হওয়া বাঞ্চনীয়।

ইসলাম একটি স্পষ্ট বিষয়। এখানে হালাল-হারামের সীমা খুবই পরিস্কারভাবে চিহ্নিত। ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী একই সাথে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের অনুসরণ করা যায় না। তাতে যতই সমস্যা হোক না কেন। বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে তাকওয়া আলাপ তোলা এবং তার পরিপালনে যেসব বাস্তবতা সামনে আসে তাতে অস্বস্তি তৈরি হয় সত্য। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকওয়া অর্জনের অন্যতম নির্দেশক আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এমন কোন কিছুকে অস্বীকার করা এবং প্রত্যেক মুমিনের জন্য সেগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অপরিহার্য।

পর্দা
তাকওয়া অর্জনের আরেকটি প্রভাব হলো পর্দার নিবিড় অনুশীলন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পর্দা করা আবশ্যক। এবং পর্দা একই সাথে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়।
ইসলামে পর্দা বলা হয় মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও দেখা-সাক্ষাতের নীতিমালা অনুসরণ করা। ইসলামে কারো সাথে দেখা করা, পোশাক পরিধান করা এবং সম্পর্ক গড়ার বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে; যা সমাজে সুস্থ ও নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এখানে প্রসঙ্গত; পর্দা মানে নারীর পোশাক নির্দেশনা ও নারীর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা না। পর্দা হল সমাজের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট একটি নির্দেশনা যা সমান্তরালভাবে নারী-পুরুষ উভয়কেই নির্দেশ করে। রোজায় ব্যক্তিকে তাকওয়া অর্জিত হলে পর্দা সম্পর্কিত বিষয়াবলীতেও তার প্রভাব পড়বে। যার সামাজিক প্রভাবও দৃশ্যমান হতে বাধ্য।

আমাদের সমাজে মহাসমারোহে রোজা উদযাপন হওয়ার সাথে সাথে পর্দা সম্পর্কে নেতিবাচক আচরণও পরিলক্ষিত।
সমাজে পরকীয়া বেড়েছে। পরকীয়ার অনেকগুলি স্তর। একেবারে চূড়ান্ত স্তর হলো, বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর প্রাথমিক স্তর হলো দাম্পত্য সঙ্গীর চেয়ে অন্য কাউকে ভালোলাগা এবং তা অনুভব করা। এর মাঝে আরো বহুবিধ স্তর রয়েছে যা এখানে আলোচ্য নয়। এই পরকীয়া বিস্তারের প্রধান কারণ হলো পর্দাহীনতা।
পর্দাহীনতার আরেকটি নির্দেশক হলো, বিবাহপূর্ব প্রেমের সম্পর্ক। তরুণ প্রজন্মের প্রায় শতভাগ বিবাহপূর্ব প্রেমের সম্পর্কে জড়িত। শিক্ষিত তরুণদের মাঝে বিবাহপূর্ব প্রেম না থাকাকে বরং দোষণীয় মনে করা হয়। পর্দাহীনতার আরেকটি নির্দেশক হল নাটক-সিনেমার আধিক্য এবং সেখানে দেহ প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া। এই আধিক্য ও বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো, সমাজে এগুলোর চাহিদা রয়েছে। এর অর্থ হল, রোজায় যে তাকওয়া অর্জন হওয়ার কথা তা অর্জন হচ্ছে না। তাকওয়া অর্জিত হলে সমাজ থেকে পরকীয়া, বিবাহ বহির্ভূত প্রেম, নাটক-সিনেমায় দেহবাদীতা কমে যাওয়ার কথা। পর্দাহীনতার আরেকটি নির্দেশক হল ফ্যাশন। বাংলাদেশে পোশাকের ডিজাইনের মূল থিম হলো, শরীল আবৃত করা না বরং দেহের মোহনীয় উপস্থাপন। বেহায়াপনায় ভরা এই ফ্যাশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষের তাকওয়া অর্জন হচ্ছে না।

দুর্নীতি কমে যাওয়া
তাকওয়ার আরেকটি নির্দেকশ হলো দুর্নীতি কমে যাওয়া। দুর্নীতি কেবল আর্থিক জালিয়াতির সাথেই সম্পর্কিত নয় বরং যার যে কাজ করার কথা সে সেভাবে সেই কাজ না করাই হলো দুর্নীতি। আর্থিক জালিয়াতি অবশ্যই দুর্নীতির প্রধান বিষয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে রোজা পালনে উৎসাহ রয়েছে সেখানে দুর্নীতি কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে আর্থিকখাতের প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির সাথে সাথে ব্যক্তিখাতের দুর্নীতিও সীমাহীন। এখানে ওজনে কম দেওয়া, দায়িত্বে ফাঁকি দেওয়া, সুযোগ পেলে মানুষকে জিম্মি করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা সার্বজনীন। একজন সচিবও সুযোগ পেলে টাকা নিচ্ছে আবার একজন রিকশাচালকও সুযোগ বুঝে ভাড়া দ্বিগুন করছে। একজন বড় আমদানিকারকও পণ্যে ভেজাল দিচ্ছে; আবার ফুটপাতে ব্যবসা করা ব্যক্তিও একই কাজ করছে। একজন চাকুরীজীবি বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে বাসে-রিকশায় দুর্নীতির শিকার হয়ে অফিসে গিয়ে দুর্নীতি করছে; আবার রিক্সাওয়ালা অফিসে দুর্নীতির শিকার হয়ে রাজপথে দুর্নীতি করছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সবাই দুর্নীতিবাজ একই সাথে নিজেও দুর্নীতির শিকার। দুর্নীতির ঘূর্ণিপাকে সবাই সবাইকে ঠকাচ্ছে। কোন সমাজে মানুষের মাঝে সামান্যতম তাকওয়া থাকলে সেই সমাজ এভাবে দুর্নীতির ঘূর্ণিপাকে নিমজ্জিত হতে পারে না।

মানুষের অধিকার
তাকওয়ার আরেকটি নির্দেশক হলো মুত্তাকি ব্যক্তি মানুষের অধিকার বা হকের ব্যাপারে দায়বদ্ধ হবে। মানুষের হক জটিল বিষয়। আল্লাহ তায়ালা তার নিজের হক মাফ করলেও মানুষের হক তিনি মাফ করেন না। শাহাদাতের মত সৌভাগ্যময় নেয়ামতও মানুষের হক রহিত করতে পারে না। মানুষের হক বিস্তৃত বিষয়। অন্য মানুষের টাকা, সম্মান, প্রাপ্য ইত্যাদি বান্দার হকের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে রোজা না রাখা সামাজিক অপরাধ সেখানে এত ব্যাপক ও নগ্নভাবে মানুষের হক হরণ করা হয় তা কল্পনাতীত; কিন্তু তাই হচ্ছে।

ভোটাধিকার মানুষের একটি হক। এটি একটি মৌলিক অধিকার। মানুষ নিজে একজন খলিফা হিসেবে শাসক নির্বাচন সম্পুর্ন স্বাধীন ও কতৃত্বশীল। এটা মানুষ হিসেবে এবং আল্লাহর খলিফা হিসাবে তার অধিকার। আধুনিককালে শাসক নির্বাচন জীবনের বহুমাত্রার সাথে সম্পর্কিত। নিজের জীবন, সম্পদ, সন্তান, সম্মান ও বিশ্বাসের বিকাশ এবং নিরাপত্তার জন্য শাসক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের সেই হক বা অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি বা দলে অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং যারা তাদেরকে সমর্থন করছে তারা সবাই ১৬ কোটি মানুষের হক নষ্ট করার অপরাধে অপরাধী। তাকওয়ার বিন্দুমাত্র থাকলেও কেউ মানুষের ভোটাধিকার এভাবে কেড়ে নিতে পারে না। এবং যারা কেড়ে নিয়েছে তাদেরকে কোন মুত্তাকি ব্যক্তি সমর্থন করতে পারে না এবং কোন অজুহাতেই মানুষের হক কেড়ে নেওয়া বৈধতা পেতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনতার সম্পদ। রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকাতে প্রতিজন মানুষের হক রয়েছে। রাষ্ট্রের এক টাকা কেউ অবৈধভাবে নিলে ১৬ কোটি মানুষের কাছে মাফ চাইতে হবে। ফলে রোজা রাখে এমন কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রের এক টাকাও অবৈধভাবে নিতে পারে না।
কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির মহোৎসব চলছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করে, ভাউচার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করা হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জিনিসপত্র কেনার নামে এবং প্রশিক্ষণের নামে এমন নির্লজ্জভাবে টাকা চুরি করে তাকওয়ান লোকের পক্ষে তো তা সম্ভবই না এমনকি সামান্য চক্ষুলজ্জা রয়েছে এমন ভদ্র মানুষের পক্ষেও তা সম্ভব না। তারপরেও বাংলাদেশে বালিশকাÐ, পর্দাকান্ড ঘটছে।

গীবত মানুষের হক নষ্ট করার আরেকটি বড় উপকরণ। গীবত হলো অন্যের সেই দোষ চর্চা যা ব্যক্তির অগোচরে করা হয়। বর্তমানে গীবত একটি সার্বজনীন মহামারীর রুপ নিয়েছে। তাকওয়ার অন্যমাত্রাগুলোতে উত্তীর্ণ ব্যক্তিরা গীবতে লিপ্ত হচ্ছে। রোজায় যদি তাকওয়া অর্জিত হতো তাহলে গীবত আবশ্যকীয়ভাবে কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু ….
মানুষের সম্মানহানী করা মানুষের হক নষ্টের আরেকটি নিকৃষ্ট উপকরণ। এখন মানুষের সম্মান নষ্ট করা সহজ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত অনলাইনে। সেখানে গোপনে মানুষের কথাবার্তা রেকর্ড করা হয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, খুঁজে খুঁজে মানুষের দোষ ত্রুটি সামনে আনা হয়। মানুষের দোষ খোঁজার জন্য কমিটির পর্যন্ত করা হয়। সিন্ডিকেট প্রচারণা চালিয়ে মানুষের সম্মানহানি করা হয় যা তাকওয়াবান সমাজে কখনো কল্পনাই করা যায় না।

বদদ্বীনি কমে যাওয়া।
তাকওয়ার প্রধানতম প্রকাশ হলো ব্যক্তির আমল বাড়বে। শরিয়াহ পালনে নিবিষ্টতা বৃদ্ধি পাবে। এর সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। যেমন কোন সমাজে তাকওয়াবান ব্যক্তির আধিক্য থাকলে সেখানে বিড়ি-সিগারেট ও মদের ব্যবহার কমে যাবে, ব্যবসায়ীদের মাঝে কারসাজি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো বানানোর প্রবণতা কমে যাবে। বাংলাদেশ এতো আয়োজন করে রোজা উদযাপন করা হয় আবার সেই রোজাকে কেন্দ্র করেই মজুতদারী, কালোবাজারি ও কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিবছর বিড়ি-সিগারেটের উপরে কর বৃদ্ধির পরেও বিড়ি-সিগারেট কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে মদের ব্যাপকতা এতটাই বেড়েছে যে এখন সরকার মদের লাইসেন্স পর্যন্ত দিচ্ছে!
জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।
জালিম শাহীর সামনে সত্য কথা বলা মুত্তাকীদের একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। মুত্তাকিরা কোন জালিম শাসককে ছেড়ে কথা বলতেন না। এতে কারো জীবন গেলেও তা তারা পরোয়া করতেন না। অথচ বাংলাদেশে জালিম শাসকদের সাথে এক ধরনের সহ-অবস্থানের পরিস্থিতি চলে গেছে জনতা। নিজের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার আগ পর্যন্ত কেউ কোন অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন না। কোন তাকওয়াবান সমাজে এটা ভাবা যায় না।

মানুষকে কষ্ট না দেয়া।
মানুষকে কষ্ট না দেওয়াকে হাদিসে মুমিনের জন্য শর্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সম্মিলিত রোজা পালনকারী জাতির প্রায় প্রত্যেক সদস্য কোন না কোনভাবে মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পপতিরা অবলীলায় বাতাস-পানি দূষণ করছে, দোকানদারেরা দোকানের সকল আবর্জনা রাস্তায় নিক্ষেপ করছে, বসতবাড়ির ময়লা-আবর্জনা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলা হয়, উচ্চস্বরে মাইক বাজানো হয়, বাড়ি বানাতে গিয়ে বায়ু ও শব্দ দুষণ করা হয়। ইত্যাদি নানাভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের ক্ষতি করছে। যার সম্মিলিত ফলাফলে বুড়িগঙ্গা আজ নর্দমায় পরিনত হয়েছে। ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাস হিসেবে কলংকিত হয়েছে।

শেষ কথা
রোজাকে ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া অর্জন করার জন্য। তাকওয়া ব্যক্তিগত বিষয় কিন্তু তার প্রভাব সম্মিলিত জীবনের উপরে পড়ে। কোন সমাজের সম্মিলিত জীবনাচার দেখে সেই সমাজের মানুষের তাকওয়া পরিমাপ করা যায়। বাংলাদেশের যা পরিস্থিতি তাতে স্পষ্ট যে, আমরা আয়োজন করে মহাসমারোহে রোজা পালন করলেও আমাদের তাকওয়া অর্জন হচ্ছে না। আর রমজান মাস পাওয়ার পরেও যদি তাকওয়া অর্জন না হয় তাহলে তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য। জাতি হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদদোয়ায় নিক্ষিপ্ত না হতে চাইলে আসুন সত্যিকার অর্থেই তাকওয়া অর্জন করি। তাকওয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক মাত্রাগুলো নিয়ে সচেতন হই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের কবুল করুন। আমীন

 

Related posts

Top