শাইখ হাসান তুরাবী; জীবন ও কর্ম-২

শাইখ হাসান তুরাবী

শাইখ হাসান তুরাবী

জুবাইর আহসান

 

গণতন্ত্র ও শুরা প্রশ্নে হাসান তুরাবী
গণতন্ত্র ও শুরা ব্যাবস্থা সম্পর্কে হাসান তুরাবী ছিলেন একজন পজেটিভ চিন্তাধারার মানুষ। গণতন্ত্র ও শুরার সংজ্ঞায়নে পার্থক্য থাকলেও উভয় ব্যবস্থার উদ্দেশ্য এক বলে তিনি মনে করতেন । গণতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগনের অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করে, শুরা ব্যবস্থাও রাষ্ট্র পরিচালনয়া জনগণের অংশগ্রহণকেই প্রতিনিধিত্ব করে। তবে তিনি মোটাদাগে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থার বিরোধীতা করে শুরা ব্যবস্থায় মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা টেনে এনেছেন। (১২)

অর্থাৎ জনগণের অংশগ্রহণের প্রশ্নে গণতন্ত্রের জায়গাটিকে তিনি বিরোধপূর্ণ মনে করেননি কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি গণতন্ত্রকে নাকোচ করেছেন। কখন কখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আইন, সংবিধান ও নীতিনির্ধারণী প্রশ্নে সংকটের সম্মুখীন হয় কিন্তু এক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়া সুনির্দিষ্ট মূলনীতি প্রদান করে বিধায় সেই সম্ভাবনাও উত্থিত হয়না। একটি ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক’ রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হয় জনগণ যাতে তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার প‚র্ণ মাত্রায় ভোগ করতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় মানুষের নাগরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বিভিন্ন মতবাদের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন থাকে ।

ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের এসব মৌলিক অধিকার গুলো ব্যাহত হবার সম্ভাবনা থাকে। অপরদিকে ইসলামে এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ থাকেনা। তুরাবী উদারবাদের উপর জোর দিতেন । তিনি মনে করতেন সম্রাজ্যবাদ ও ক্রমাগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোন বিপ্লবই গঠনম‚লক হবেনা যদিনা এই উম্মাহ প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তাশীল না হতে পারে এবং উদার দর্শন ধারণ না করতে পারে। যুগসাপেক্ষে ইসলামের ব্যাখার অপরিহার্যতা ও অভাব হাসান তুরাবী প্রথম থেকেই উপলব্ধি করেছেন , তাই তিনি কোরান হাদীসের প্রচলিত ব্যাখার চেয়ে যুগসাপেক্ষ আধুনিক ব্যাখার উপর জোর দিয়েছেন। ঈমান, কুফর নিয়ে তার সমসাময়িক চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ কুতুব , আবুল আলা মওদুদী সাহেবদের বিরোধীতাও করেছেন তার লেখনীর মাধ্যমে ।

সর্বোপরি তার কল্পনার ইসলামী রাষ্ট্রটি ছিল বর্তমান আধুনিক পাশ্চত্য রাষ্ট্রগুলোর চেয়েও অগ্রসরমান। যেখানে পাশ্চত্য ব্যাবস্থায় মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, ব্যাক্তিগত ও কর্মজীবনকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে কথিত ফ্রিডম বা লিবার্টির কথা বলছে, সেখানে মানুষের সাথে সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের মেলবন্ধনের মাধ্যমে মানুষের প‚র্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার সমৃদ্ধ একটি ইসলামী রাষ্ট্রের বয়ান তার লেখনীতে বারংবার উঠে এসেছে।

তিনি রাষ্ট্র গঠনে সামাজিক চুক্তির ঐতিহাসিক তত্বকে পাশ্চত্য দর্শন থেকে মেনে নেন নি ।বরং তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে সামাজিক চুক্তি তত্বের পাশ্চত্য দার্শনিক ব্যখ্যা গণতন্ত্রকে পৃথিবীর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যার্থ করেছে। গণতন্ত্র যে নামকা ওয়াস্তাভাবে কয়েকটি উন্নত দেশে পুঁজিবাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যাবহৃত হওয়া ছাড়া বেশীরভাগ তৃতীয় বিশ্বের দেশে শোষণের অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার হচ্ছে , সেটা উলে­খ করেন এবং এর পেছনে পাশ্চত্য দর্শনের সামাজিক চুক্তি তত্বের বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যাকে দায়ী করেন। তিনি তৃতীয় বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমস্যার সমাধানকল্পে কয়েকটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। যেমনঃ স্ব স্ব সমাজে তাদের ঐতিহ্য অনুসারে মানুষের সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, গরীব বান্ধব অর্থনীতি , রাজনৈতিক অঙ্গনে সামরিক হস্তক্ষেপ বিলোপ এবং পাশ্চত্য রাজনৈতিক,সামরিক, মনসতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিলোপ। তৃতীয় বিশ্বে শাসনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক সংকট মোকাবেলায় তার চিন্তার প্রসারতা তার এই দিকনির্দেশনা থেকে উপলব্ধি করা যায়। (১৩)

তুরাবীর রাষ্ট্রচিন্তায় ইসলাম ও খোদায়ী সার্বভৌমত্বের প্রতি তার অটল অবস্থান আরো পরিষ্কার হয় যখন ১৯৬৫ সালে সংবিধান খসড়া কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন।তিনি তার প্রস্তাবনায় উলে­খ করেন , “এই সংবিধান পরিষদ তার কার্যাবলে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রশাসন এবং এটি হচ্ছে খোদার পরে উম্মাহর সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ” । তার এই সংবিধান প্রস্তাবনায় সরাসরি খোদায়ী সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। সুদানে সংবিধান সংকটের কারণ হিসাবে তিনি বলেন, সুদানেই এই সংবিধান নিছক বিদেশীদের দেয়া একটি কঙ্কাল যা সুদানী মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। একদিকে সংবিধান প্রণয়নে পাশ্চত্য প্রভুদের অস্বীকার করা অপরদিকে সংবিধানে সৃষ্টার প্রভুত্বকে স্বীকার করার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রে ইসলামকে একটি অপরিহার্য জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তুরাবী সুদান পার্লামেন্টের স্পীকার হন এবং ১৯৯৮ সালে প্রণীত সুদানী সংবিদানে তুরাবীর চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটে।বিশেষ করে তার প্রিয় তাজদীদ বা ইসলামী পুনর্জাগরণ ভাবনা এখানে পরিষ্কার ভাবে প্রতিফলিত হয় । তাছাড়া এ যাবৎকাল তাঁর লেখালেখি ওবক্তৃতায় যেসব বিষয় উঠে আসত তাও সংবিধানে প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন তিনি মুসলিম দুনিয়ার জনপ্রিয় ধারণা খেলাফতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগন ও ঐশী সার্বভৌমত্বের একটি সমন্বিত রূপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

সংবিধানের ভাষায়, “Supremacz in the state is to God, the Creator of human beings and sovereigntz is to the divergent people of the Sudan who practice it as worship of God, bearing the trust, building up the countrz and spreading justice, freedom and public consultation” ১৪

হাসান তুরাবীর জাগরণী ভাবনা
হাসান তুরাবী ছিলেন একজন পুরোদস্তুর পুনর্জাগরণবাদী। যেটিকে তিনি উলে­খ করেছেন তাজদীদ হিসেবে। তাজদীদ মানে সম‚লে পরিবর্তন কিংবা গোটা মৌলিক ব্যাবস্থারই উৎপাটন এই চিন্তায় তুরাবী বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন , “ কুরানের বানী মহান আল্লাহর কাছ থেকে প্রদত্ত শ্বাসত ও পূর্ণাঙ্গ সত্য ,কিন্তু কুরানের এই বার্তার বাস্তবায়ন সময় , মানুষ ও স্থানভেদে পরিবর্তিহ হয়” ।

তিনি বিশ্বাস করতেন আমাদের অতীত অনেক উজ্জ্বল এবং অতীত কালের জ্ঞানী ও মুজতাহিদরা তাদের সময়ের জন্য সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন। কিন্তু সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখলে মুসলিম জাতির দৈন দশা থেকে মুক্তি অসম্ভব।তিনি বলেন , “ পুরনো বই খনন করে সমাধান খোজার পরিবর্তে আমাদের ম‚লে ফিরে যেতে হবে এবং এই ম‚লনীতি অনুসারে বর্তমান সমস্যা সমাধানে এক বিল্পব সৃষ্টি করতে হবে” ।

হাসান তুরাবী মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য ইজতিহাদের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।প্রত্যেক যুগে যুগে সে যুগে মুজতাহিদরা ইজতিহাদের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসকে অলংকৃত করেছেন। তিনি তাজদীদ বা পুনর্জাগরণ ঘটানোর জন্য শুধু মাত্র তাকলীদে আবদ্ধ না থেকে বর্তমান যুগ স্বাপেক্ষে শরিয়াভিত্তিক ইজতিহাদের উপর জোর দিয়েছেন।হাসান তুরাবীর মতে ফিকাহ বিষয়ক মৌলিক সমস্যাটি হল, মানুষ ফিকাহ ও ফিকহের মৌলিক কিছু নীতিমালাকে বিমুর্ত ধরে নিয়েছে কোরান হাদীসের ন্যায়।যার ফলে তাদের মেধায় বান্ধত্য ও অসারতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই অসার মস্তিষ্ক থেকে উদ্ধুদ্ধ ফিকাহ আদতে ফিকাহ তো নয়ই বরং এগুলো সমাজে নোংরা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে যার শেষ আদতে নেই। (১৫)

হাসান তুরাবীর মতে মানুষের জ্ঞান সময় সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল এবং এই সময়ে এসে এটি প্রকান্ড আকারে বিকশিত হয়েছে। ইতিহাসে ফিকাহবিদদের অবস্থান তাদের সময়কালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ ছিল।এসময়ের মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য হবে ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে একটি নতুন অবস্থান তৈরি করা যাতে মহান আল­াহর প্রকৃত নির্দেশ আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি।এই নতুন ফিকাহর বৈশিষ্ট হবে ঐতিহাসিক ফিকাহ শাস্ত্রকে একত্রিত করে , সেগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে যাচাই করার মাধ্যমে গ্রহণ করা এবং নিত্য নৈমিত্তিক পরীক্ষাম‚লক বিজ্ঞান ইসলামের প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় তার জবাব দেয়া।তুরাবী “আলেম” শব্দটির পরিমন্ডলকে আরো বিস্তৃতভাবে চিন্তা করতেন।

তিনি যেকোন জ্ঞান, যা সৃষ্টিকে সৃষ্টার নিকট পৌছে দেয় , এমন বৈশিষ্ট্যম‚লক জ্ঞানগুলোকে তিনি প্রকৃত জ্ঞান বলে মনে করতেন । সেই অর্থে তিনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিকদের যেকোন জ্ঞান যা সৃষ্টাকে অগ্রাহ্য করেনা সেগুলোকে গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। হাসান তুরাবীর মতে বিস্তৃত জ্ঞান বিকাশের এই যুগে ইসলামের আধুনিক ফিকাহ সংস্কারে শুধু ঐতিহ্যগতভাবে যারা আলেম হিসেবে পরিচিত তারা এগিয়ে আসলেই হবেনা বরং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে মুসলিমরা চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে ফিকাহ কে বিকশিত করবে। (১৬)

লক্ষণীয় বিষয় এই যে, হাসান তুরাবী নামায, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত , পবিত্রতা , অপবিত্রতা , ঈমান , কুফর বিষয়ক ইসলামের মৌলিক শাখাগুলোতে ফিকাহ সংস্কারের কোন প্রস্তাব করেন নি। বরং ফিকাহ শব্দের দ্বারা তিনি আধুনিক সময়ে উদ্ধুত সমস্যা গুলোর আধুনিক মূলনীতি অনুসারে সম্মিলিতভাবে সমাধানের পক্ষপাতী ছিলেন। হাসান তুরাবীর প্রস্তাবিত ফিকাহ শাস্ত্রের নতুন ক্ষেত্রকে আমাদের দেশে প্রচলিত গায়রে মুকালি­দ কিংবা আরবের নব্য সালাফিবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই।

বরং হাসান তুরাবীর ফিকাহ ইসলামী রাজনৈতিক, সামাজিক , বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক সময়ে উদ্ধুত ক্রমশ জটিল সমস্যার উত্তরনে ফিকাহ শাস্ত্রকে একটি বৃহত রূপে দেখতে চেয়েছেন।

একটি ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য হাসান তুরাবী ফিকাহ শাস্ত্র উন্নয়নের পাশাপাশি সেই ইসলামী শাস্ত্রকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছেন। হাসান তুরাবী অপরাপর তাত্বিকদের মত শুধু তত্ত¡ দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেন নি বরং তার বহু আধুনিক তত্ত¡কে তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে বাস্তবায়ন করে গেছেন যা সুদানের মত একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় সমাজ ও অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল একটি রাষ্ট্রে যারপরনাই দুরুহ ব্যাপার ছিল।

নারী প্রশ্নে হাসান তুরাবী
৫০/৬০ এর দশকে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ব্লক ও ক্যাপিটালিজম ব্লকের মধ্যকার দ্বন্দের প্রভাব পড়েছিল সুদানেও। সুদানে তরুণ তরুণীরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করলেন এবং কমিউনিস্টদের সমর্থন ক্রমশ বেড়ে চলছিল। হাসান তুরাবী কমিউনিস্ট আদর্শকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয়ভাবে মোকাবেলা করেন। তিনি সুদানের পিছিয়ে পড়া নারীদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভুত হন।

প্রথাগতভাবে নারীদের রক্ষণশীলতা ও সমাজের গৌণ ভ‚মিকার বিরুদ্ধে তুরাবী রুখে দাঁড়ান।ইসলাম যে নারীকে কিংবা নারীর অবদান কে খাটো করে দেখে নি বরং নারী ও পুরুষকে একে অপরের পরিপ‚রক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোকে জোর দিয়ে প্রচার চালান।হাসান তুরাবীর মতে , ‘ইসলামে নারীরা সমমর্দাযাপূর্ণ স্বাধীন সত্বা। কুরানে আল্লাহ নারীদের সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন, ব্যাপারটি এমন নয় যে পুরুষ মানুষদের মাধ্যমে নারীদের কাছে হুকুম আহকাম জারি হয়েছে।’ (১৭)

তিনি নারীদের দায়িত্ব কর্তব্য ও পুরুষদের দায়িত্ব কর্তব্যকে পার্থক্য করে দেখান নি, বরং হুকুম হিসেবে সেটা নারীর ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান গুরুত্ব বহন করে।ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের সক্রিয়তার উদাহরণ টেনে তিনি সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীদের অবদানের কথা , সুদানের পিছিয়ে পড়া নারীদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়ে দিতে সক্ষম হন। এর ফলে কমিউনিস্টদের আদর্শের প্রতি নারীদের যে স্রোত বইছিল তা উল্টোদিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং দলে দলে নারীরা ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে হাসান তুরাবীর ‘ইসলামী চার্টার ফ্রন্টে’ যোগ দিতে শুরু করে। নারীদের প্রশংশায় হাসান তুরাবী বলেন, ইসলামী চার্টার ফ্রন্টে নির্বাচন গুলোতে নারীদের সক্রিয়তা ছিল পুরুষদের চেয়ে বেশী।তারা দল বেঁধে প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ইসলামের পক্ষে অবস্থান তৈরি করে।

তুরাবী মনে করতেন, প্রচলিত ধর্মীয় ধারা ভেঙ্গে নারীদের মধ্যে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবেই এবং সেটাকে কোনভাবেই ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা।তাই ইসলামপন্থীদের অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব হবে ইতিহাসে তৈরি হওয়া নারী ও পুরুষদের মাঝে দূরত্বকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করে ইসলামের একটি আদর্শর‚প তৈরি করা। ১৮

হাসান তুরাবীর অবদান ও একটি নির্মোহ পর্যালোচনা
হাসান তুরাবী যে মুসলিম বিশ্বের অমূল্য সম্পদ সেটি মুসলিমদের চেয়ে পাশ্চত্যের অমুসলিমরা বেশী টের পেয়েছিলেন বলে ধারণা পাওয়া যায়। হাসান তুরাবীকে নিয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ক্যাম্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তার রাষ্ট্র চিন্তা, সুদানের রাজনীতিতে তার ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর প্রভাব নিয়ে পাশ্চত্য বিশ্ব কড়া নজর রেখেছে।

হাসান তুরাবীর উদারবাদী চিন্তাভাবনায় তাকে মার্কিন ব্লকের মডার্ন ইসলামপন্থী ভাবার সুযোগ নেই। বরং মার্কিনীরা হাসান তুরাবীকে একটি বিশুদ্ধ খেলাফত প্রতিষ্ঠায় বিশ্বব্যাপী জিহাদপন্থীদের অনুপ্রেরণা হিসেবে মনে করেন। হাসান তুরাবী তার ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তাধারায় একটি ব্যাতিক্রমী পরিমন্ডল সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুদানের রাজনীতিতে ইসলামের ভিত্তিম‚লে একজন শক্ত স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছেন। হাসান তুরাবীর বৈচিত্রময় জীবনে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচী সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছে। ইসলামের আন্তর্নিহিত শক্তিতে তিনি ছোটবেলাথেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম হন। হাসান তুরাবী ইসলামকে চাপিয়ে দেয়ার পরীবর্তে ইসলামকে মানুষ তৈরির একটি যুগান্তকারী অস্ত্র হিসেবে দেখতেন।

মানুষের চারিত্রিক সংশোধন , আতœশুদ্ধির উপর তার সজাগ দৃষ্টি ছিল। হাসান তুরাবীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষকে জাগ্রত করার প্রচন্ড ক্ষমতা। রাজনৈতিক বিভিন্ন পট পরিবর্তনে সবসময় জনমানুষের আশা আকাঙ্খার বাতিঘর হিসেবে হাসান তুরাবী সুদানবাসীদের মনিকোঠায় নিজেকে স্থান দিয়েছিলেন। হাসান তুরাবীর বৈশ্বিক অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনে হাসান তুরাবীর চিন্তাভিত্তি আরো শতবর্ষব্যাপী ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝে আলো ছড়াবে। হাসান তুরাবী বিগত হলেও তার চিন্তা ধেয়েছে সময়ের ও বহুক্রোশ আগে। অধিকার বঞ্চিত নারী সমাজের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে এই আধুনিক যুগেও সফেদ পাগড়ি পরিহিত একজন সদাহাস্যোজ্জল মানুষ যে পৃথিবীর যেকোন নারীবাদীর চেয়ে , নারী অগ্রগতিতে ভ‚মিকা রাখতে পারেন সেটা হাসান তুরাবীর জন্ম নাহলে পৃথিবীবাসী হয়ত জানত না।

হাসান তুরাবীর শেষজীবনে কুরানের ব্যাখ্যাগ্রন্থ Understanding the Quran লেখায় নিমগ্ন ছিলেন। ২০১৬ সালের ৫ই মার্চ বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের দিকপাল, ইসলাম বাস্তবায়নে সদা জাগরুক এই সৈনিক তার কুরানের ব্যাখ্যা গ্রন্থ অসমাপ্ত রেখে, মহান প্রভুর ডাকে ইহলোক ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্রঃ

১২. Hassan Al Turabi, Tajdij ,pp. 79-80

১৩. Ahmad S. Moussalli ,HASAN AL-TURABI’S DISCOURSE ON DEMOCRACY

১৪.`Lzb, John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporarz Islam

১৫.  Abdel Wahab El-Affendi, TurabiÕs Revolution: Islam and Power in Sudan. London: Grez Seal,

1991.

১৬.  Hasan Turabi, ÒThe Islamic StateÓ, in Voices of Resurgent Islam. Ed, John L. Esposito. New

York: Oxford Universitz Press, 1983.

১৭.  Hasan Turabi, Women in Islam and Muslim Societz. London: Mile Stones, 1991.

১৮। প্রাগুক্ত।

 

 

 

Related posts

Top