শাইখ হাসান তুরাবী রহ; জীবন ও কর্ম-১

হাসান তুরাবী

শাইখ হাসান তুরাবী রহ.

জুবাইর আহসান

 

৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালের গোধূলীমাখা এক সন্ধ্যায় সুদানের খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্যানেল বক্তৃতায় হঠাৎ ফ্লোর নিলেন ফ্রান্সের প্যারিস থেকে পিএইচ ডি করে সদ্য ফেরা এক তরুণ বক্তা। সুদানের মাটির ধুসর কালো বর্ণে আচ্ছাদিত এই অচেনা পুরুষটি খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক হাসান তুরাবী । সুদানের তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় করণীয় শীর্ষক এক প্যানেল বক্তৃতায় অংশ নিয়ে জীবনের অন্যতম সেরা ভাষনটি প্রদান করেন হাসান তুরাবী নামক স্বল্প পরিচিত এক ব্যাক্তি,খনিকের মধ্যেই যার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে উঠেছিলেন উপস্থিত সকল শ্রোতা।(১)

এই হৃদয়গ্রাহী বক্তাই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক সুদানের স্থপতি এবং বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম চিন্তাবিদ ও প্রবাদপুরুষ । হাসান তুরাবী তার জীবন দর্শন ও কর্মকে এত বড় ও বিস্তৃত করে গেছেন যে কয়েকটি বা কয়েকশত বা কয়েক সহস্র পৃষ্ঠায় তা ধারণপযোগ্য নয়। তথাপি, খুব স্বল্প পরিসরে বিংশ ও একবিংশ শতকে সমান প্রভাব বিস্তারকারী এই মহান চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে জানার প্রয়াসে এই নিবন্ধটি রচিত হচ্ছে।

সুদানের সর্বকালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বদের মধ্যে হাসান আল তুরাবী অন্যতম বলে বিবেচিত হন। (২) স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি বহুবার জেলবন্দী হন এবং বন্দী সময়টাকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকে শানিত করতে ব্যবহার করেন। ড. হাসান আল তুরাবীর গুরুত্ব তার নিজ দেশ সুদানকে অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। তিনি একাধারে সংগঠন, রাজনীতিবিদ , চিন্তাবিদ ,দার্শনিক, আইনজ্ঞ , সংবিধানবিদ, সংস্কারক এবং একজন ইসলামী বিপ্লবী ।

সুদান সংসদের স্পিকার, এটর্নী জেনারেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী,উপপ্রধানমন্ত্রীসহ নানাপদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করেছেন। আধুনিক বিশ্বে ইসলামের উদারননৈতিক ও প্রগতিশীল ব্যাখা প্রদান করে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার মোকাবেলা করেছেন,কথিত নারীবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তিনি বর্ম হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। তবে একটি ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধানব্যাবস্থা প্রণয়ণে তিনি ছিলেন আপোষহীন।

তার উদারনৈতিকতা ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপোষহীনতা মুসলিম বিশ্বে তার আবেদনকে চির অম্লান করে রেখেছে।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
হাসান তুরাবী জন্মগ্রহণ করেন, ১ই ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৩২ সালে লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষা সুদানের পুর্বাঞ্চল কাসালায় । তার পরিবার ছিল ঐতিহ্যগতভাবে সুফী ঘরনার এবং তিনি ছিলেন সুদানের বিখাত সুফী হামাদ আল তুরাবীর উত্তসুরী। হাসান তুরাবীর পিতার নাম আব্দুল্লাহ দাফালা আল তুরাবী এবং মাতার নাম নাফিসা । তিনি ছিলেন পরিবারের তৃতীয় এবং সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ।একটি ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তুরাবীর পরিবার ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় অনন্য। তাঁর পিতা ছিলেন বৃটিশ সম্রাজ্যবাদী শাসনাধীন সুদানের শরিয়া কোর্টের একজন বিচারক।

শিশু থাকা অবস্থায় তুরাবী তার মাকে হারান , পরবর্তীতে তিনি তার পিতার কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।তার পিতা তুরাবীর আত্মশুদ্ধিমূলক শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পরিবারের জ্ঞানী সদস্যদের সংস্পর্কে থেকে খুব কম বয়সেই আরবী ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। তুরাবী তার মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন সুদানের হান্তুব মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে , যা পরিচালিত হত বৃটিশ কারিকুলামে। সাধারণত তৎকালীন সুদানে মাদ্রাসা ও সেকুল্যার শিক্ষা ছিল পৃথক । হাসান তুরাবী দ্বীনি শিক্ষা ও সেকুল্যার শিক্ষা দুটোতেই গুরুত্বপ্রদান করেন যা পরবর্তীতে তাকে ইসলামের সাথে অপরাপর আদর্শগুলোর তুলনামুলক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল।

হান্তুব থেকে মাধ্যমিক পাশ সমাপ্ত করে তিনি খার্তুম কলেজে যোগদান করেন। খার্তুম কলেজে তখন কমিউনিস্টদের প্রভাব ছিল উলে­খ করার মত। কমিউনিস্ট দের বিরুদ্ধে হাসান তুরাবী ও তার ইসলামপন্থী বন্ধুরা মিলে ১৯৫১ সালে ইসলামী লিবারেশন মুভমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার মাধ্যমে পাশ্চত্য ও কমিউনিষ্ট প্রভাবের বিরুদ্ধে ইসলামিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যান।

ইসলামী লিবারেশন মুভমেন্টে যদিও ইখওয়ানুল মুসলিমীন এর প্রভাব ছিল তবে মুলত সংগঠনটি ছিল সুদানী লিবারেশন মুভমেন্ট(কমিউনিস্টপন্থী) সংগঠনটির বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদের একটি প্রতি-সংগঠন। খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল এল বি সমাপ্তির পর তিনি স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে চলে যান এবং সেখান থেকে ১৯৫৭ সালে আইনে মাস্টার্স ডিগ্রী নিয়ে পুনরায় খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন সময়ে হাসান তুরাবী বিবাহ করেন তারই ছাত্রী রিসাল আল মাহদী, যিনি শুধু তার একজন উজ্জ্বল ছাত্রীই ছিলেন না বরং সুদানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী সাদ আল মাহদীর বোন। এছাড়াও হান্তুব স্কুলে পড়াশোনার সময় হাসান আল তুরাবীর সহপাঠী ছিলেন ভবিষ্যৎ সুদানের প্রথম সারির নেতৃব্দৃন্দ। পুরো শিক্ষাজীবনেই রাজনীতি সক্রিয়তার কারণে হাসান আল তুরাবী বেড়ে ওঠেন রাজনৈতিকদের আঁতুড় ঘরে, তার বন্ধুবান্ধব , পরিবার , স্ত্রী , পরিজন সবজায়গাতেই ছিল রাজনীতি সচেতনার প্রভাব।

আর তিনি আশেপাশের সকল প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গদের ছাড়িয়ে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। হাসান আল তুরাবী রহ এর একজন বড় সংস্কারক ও চিন্তাবদ হয়ে ওঠার পেছনে তার বৈচিত্রময় শিক্ষা ও কর্মজীবনের দিকে নজর দেয়া যায়।

খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করার পর সবচেয়ে তরুণ শিক্ষক হিসাবে আইন বিভাগের ডিন হবার গৌরব অর্জন করেন। এখানেই থেমে থাকেন নি তিনি। যখনই আমেরিকা যাবার সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে গিয়েও ‘ক্রিমিনাল ল ‘ এর উপর পড়াশোনা করেছেন। নিজ দেশে আইন পড়াশোনা , লন্ডনে আইনে মাস্টার্স আর আমেরিকায় ফৌজদারী আইন নিয়ে পড়াশোনা তাকে পরবর্তীতে ইসলামী আইন গবেষণা ও একটি সংবিধান রচনার প্রয়াসে যে খুব সাহায্য করেছিল তা বলাই বাহুল্য।

তুরাবী রহ এর শিক্ষাজীবনের আরো একটি আকর্ষণীয় দিক ছিল পিএইচ করার জন্য ফ্রান্সকে বাছাই করা। তিনি পাশ্চত্য দর্শনের ভিত্তিমুলকে খুব শক্তভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন। পাশ্চত্য লিবারেল ডেমোক্রেসি , লিবার্টি ও কন্সটিটিউশনালিজমের গোড়াপত্তন ঘটেছিল ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে। তাই তিনি আধুনিক দর্শনের সুতিকাগার ফ্রান্সকে বেছে নিয়েছিলেন তার উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে। যেখানে তিনি শুধু একাডেমীক পড়াশোনাই করেন নি বরং ফরাসি বিপ্লব , তার উত্থান ও বিপ্লব পরবর্তী বর্তমান অবস্থাকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হল, তার পিএইচডি আবেদন বাতিল করা হয় শুধুমাত্র এই অযুহাতে যে তিনি ফ্রেঞ্চ ভাষা জানতেন না।

তবে তিনিও দমে যাবার পাত্র ছিলেন না, ফ্রান্সের অন্যতম বিখ্যাত সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ডক্তরেট ডিগ্রীর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। ৪ ফ্রেন্স ,জার্মান ভাষা ও সুদানী বিভিন্ন উপভাষায় তখন থেকে তিনি দক্ষতা অর্জন শুরু করেন। সোরবর্নে পড়াশোনার সময় তার অন্যতম উপলব্ধির জায়গাটি ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতি। পরবর্তীতে তিনি ইউরোপীয় ও মুসলিম ট্রাডিশনাল সংস্কৃতির মধ্যে একটি যোগসুত্র স্থাপনের চেষ্টা করেন যা তার পুর্বে কল্পনা করাটা ছিল দুরূহ ব্যাপার।

হাসান তুরাবীর রাজনীতি সক্রিয়তা
ছাত্র জীবন থেকেই হাসান আল তুরাবী ছিলেন একজন রাজনীতি সক্রিয় নেতা। তৎকালীন সময়ে সমাজতন্ত্রের উত্থানের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি সুদান। সুদান ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মিশর-বৃটিশ সরকারের একটি চুক্তির দ্বারা পরিচালিত সম্রাজ্যের অধীন ছিল । ৫০ এর দশকে সুদানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানে বৃটিশ-মিশর ১৯৫৬ সালের ১ ই জানুয়ারী তাদের স্বাধীনতা প্রদান করে। কিন্তু সুদানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শাসনতান্ত্রিক ব্যাবস্থা তখনও স্থিত ছিলনা। সুদানের ইসলামী এবং সমাজতান্ত্রিক ঘরনা ছিল অনেক শক্তিশালী । কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা,সুনির্দিষ্ট শাসনতন্ত্র প্রণয়ণ এবং সুদানের রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ধারণে তখনও কোন উলে­খযোগ্য ভ‚মিকা সুদানে পরিলক্ষিত হয়নি। এই সুযোগে সুদানে সামরিক ও শ্বৈরশাসন স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। কিন্তু সুদনানের সম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনীতি সচেতন নাগরিক সমাজ ও ছাত্র সমাজ তাদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে।

হাসান আল তুরাবীর দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় আবুদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে।যেটি সুদানে অক্টোবর বিপ্লব নামে পরিচিত। সুদানে ক্রমশ ইসলাম ও আরবী সংস্কৃতির উত্থানে দক্ষিণ-সুদানীরা       (যারা মুলত অনারব ও অমুসলিম) কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং আবুদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।যা ১৯৬৪ এর এক পর্যায়ে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সে সময়টিতে সুদানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমস্যা সমাধানকল্পে আবুদ সরকার ২৫ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করে এবং সেই কমিশনের রিপোর্ট ও তৎকালীন সরকারের পদক্ষেপ জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে। হাসান তুরাবী সে সময়ে খারতুম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রভাষক । তিনি সরকারের এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে খারতুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন (যা প্রথমে উলে­খ করা হয়েছে) এবং পরবর্তীতে তা গণ আন্দোলনে রূপ নেয়।

এ আন্দোলন ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে যার নেতৃত্বের আসনে ছিলেন হাসান তুরাবী। ঐসময়ে হাসান তুরাবী নিজেও অবাক হয়ে যান এবং এই আন্দোলনের আদর্শিক প্রভাব সম্পর্কে কিছুটা অবাক হয়েই তিনি বলেন, ‘How it spreads and transfers ideals into realitz!” ।

একটি আদর্শ কিভাবে বাস্তবে রূপ নেয় তা তিনি ৬৪ এর আন্দোলনে সামনে থেকে পরখ করেছেন এবং এই আন্দোলন পরবর্তীতে সুদানে ইসলামী শক্তির অপরিহার্যতা আবশ্যক করে তোলে।

১৯৬৪ সালে আন্দোলনে সফলতার পর তুরাবী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং ‘ইসলামিক চার্টার ফ্রন্ট’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মুল উদ্দেশ্য ছিল ন‚ন্যতম একটি ইসলামী সংবিধান তৈরিতে সকল ধরনের মুসলিম দল,উপদলের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করা।

১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মত হাসান তুরাবী সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন যেখানে তার দল পরাজিত হলেও তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদদ্য নির্বাচিত হন। তার মেধা,প্রজ্ঞা এবং আইনের উপর বিশেষ দখল থাকায় তিনি সুদানের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। (৫)

এই সমসাময়িক সময়টাতে শিক্ষা অনুসদের কোন এক সভায় রাসুল (স) কে এক ছাত্র কটুক্তি করে,যার জেরে সুদান জুড়ে তীব্র বিক্ষোভের দামাডোল বেজে উঠতে থাকে। বিচার হওয়া , না হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রশ্নটিকে হাসান তুরাবী ভিন্ন দিকে ধাবিত করেন। তিনি এই আন্দোলনকে কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ব্যাবহার করেন এবং দাবীকে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করার দাবীতে রূপান্তর করেন।হাসান তুরাবীর এই কৌশলের কারণে ইসলাম বিরোধী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৫ সালে নিষিদ্ধ হয় । এর ফলে যেমন হাসান তুরাবীর উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ তীব্রভাবে সমালোচিত হয়, অপর দিকে তার মানুষের আবেগ বুঝে কৌশল হাতে নেবার চৌকান্নাও ফুটে ওঠে।সংবিধানে সংশোধন বিল আনায়নের মাধ্যমে তিনি প্রকারন্তে কমিউনিস্ট পার্টিকে সমকালীন রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সক্ষম হন। (৬)

সংগ্রাম ও কারা নির্যাতন
হাসান তুরাবী ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইসলামিক চার্টার ফ্রন্টে সক্রিয় ছিলেন। চার্টার ফ্রন্টের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অপরাপর ইসলামী দলগ্যলোর সাথে সখ্যতা এবং খসড়া সংবিধান রচয়ানায় সময় প্রদান করেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে হঠাৎ করে জাফর নিমেরি কমিউনিস্টদের মদদে সেনা অভুত্থান ঘটান এবং ইসলামী চার্টার ফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার করেন। এসময় হাসান আল তুরাবীকেও গ্রেফতার করা হয় এবং ৩ বছরের জন্য তাকে কারাদন্ড প্রদান করা হয় । জাফর নিমেরির সময়কালে ও পরবর্তীতে হাসান তুরাবী গ্রেফতার হন এবং নিমেরির সশাসনামলে প্রায় ৭ বছর কারাবরণ করেন। কারাবরণকে হাসান তুরাবী এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পুরোপুরিভাবে বই লেখায় মনোনিবেশ করেন। জেল জীবন সম্পর্কে হাসান তুরাবী বলেন, , Prison was a great opportunitz for me. I consider it to be a gift from God. বিশ্লেষকদের মত হাসান তুরাবীর শ্রেষ্ঠ বইগুলো তিনি তার কারাজীবনে লিখেছেন । (৭)

সময়ের সাথে সাথে বদলায় মানুষের চিন্তাধারা। সুদানের তৎকালীন সেনাশাসকও তার চিন্তাধারা বলদলালেন। হঠাৎ করে তার বন্ধুপ্রতিম কমিউনিস্টদের তিনি একে একে গ্রেফতার , হত্যা , জেল , জুলুমের মধ্যে দেশ ছাড়া করলেন এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দদের একে একে মুক্তি দিতে লাগলেন ।

জাফর নিমেরি ছিলেন হান্তুব স্কুলে হাসান তুরাবীর সহপাঠী। মুক্তি পাবার পর হাসান তুরাবী জনগনকে সাথে নিয়ে পালটা সেনা অভুত্থনের মাধ্যমে জাফর নিমেরিকে ক্ষমতাচ্যুত করার চিন্তা করতে লাগলেন,
কিন্তু বারং বার তা ব্যার্থ হয় এবং বিভিন্ন সময় হাসান তুরাবী কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে হাসান তুরাবী অনুধাবন করলেন , জাফর নিমেরিকে সেনাঅভুত্থান ঘটানোর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি বিকল্প হিসেবে জাফর নিমেরির সঙ্গে একাত্মা হয়ে কাজ করা শুরু করলেন । এসময়ে তিনি এটর্নী জেনারেল নিযুক্ত হন এবং সাথে সাথে জাফর নিমেরির পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন ।

হাসান তুরাবী তার সরকারী ক্ষমতাকে আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যাবহার করতে লাগলেন। তার চেষ্টা ও তৎপরতায় সুদানজুরে ইসলামী আন্দোলন বেগবান হতে শুরু করে। নারীদের তিনি ইসলামের পক্ষে বড় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। সুদানের রক্ষণশীল ও কট্টর ধর্মীয় সমাজে নারীদের নিয়ে প্রচলিত ধ্যান ধারণা বদলে দিতে শুরু করেন ।

নারীদের কাজের অধিকার , সমান বেতন ও সমান সুযোগের অধিকার প্রদান করেন। হাসান তুরাবীর এই তৎপরতার কারণে তাকে সুদানের নারী মুক্তির অগ্রপথিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথমত অনেক বাঁধার সম্মুখীন হলেও নারীদের নিয়ে কোরান হাদীসের আধুনিক ব্যাখা প্রদান করতে শুরু করেন এবং সুদানের নারী সমাজকে ইসলামের পক্ষে একটি বড় শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হন। নারীমুক্তির পাশাপাশি তিনি জোর দেন সুদানের আর্থসামাজিক উন্নয়নে। তার হাত ধরেই সুদানে ইসলামী অর্থনিতির ভিত্তি তৈরি হয়।

তিনি ‘ফয়সাল ইসলামী ব্যাংক’ নামক শরিয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং চালু করতে গুরুত্বপুর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন। অপরদিকে জাফর নিমেরি কমিউনিস্ট পন্থী হলেও , তিনি মুলত জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের দিকে বেশী মনযোগ দিতে শুরু করেন। হাসান তুরাবী, প্রধানমন্ত্রী জাফর নিমেরির উপর বিস্তর প্রভাব রাখেন যার প্রভাবে জাফর নিমেরির বিভিন্ন বক্তব্যে ইসলাম ও দ্বীনের কথা প্রতিফলিত হতে শুরু করে।

কিন্তু ৭০ দশকের শেষের দিকে জাফর নিমেরির বিরুদ্ধে আবারো অভুত্থান চেষ্টা হলে , নিমেরি কঠোর অবস্থানে চলে যান এবং হাসান তুরাবীকে তার দল ‘সুদান সমাজতান্ত্রিক দল’ এ যুক্ত হতে বাধ্য করেন। হাসান তুরাবী সমাজতান্ত্রিক দলে ঢুকে সরকারের সাথে পুনরায় কাজ শুরু করেন এবং সরকারের আইন ও বিচারমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এসময় হাসান তুরাবী রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জাফর নিমেরির সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। আরবি , ইংরেজি , জার্মান , ফ্রেঞ্চ ভাষা দক্ষতা তাকে তৎকালীন সময়ের সুদানের শ্রেষ্ঠ কুটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্টভাবে সুদানের ইসলামাইজেশন প্রক্রিয়ায় হাসান তুরাবীর প্রভাব ও রাজনীতি সম্মুখে আসে।

১৯৮৪-৮৫ সালে বদলে যায় সুদানের রাজনৈতির প্রেক্ষাপট। দ্রব্যম‚ল্যের উর্ধ্বগতি, খাদ্যসংকট চরম আকারে রূপ নেয়। দুর্ভিক্ষে পতিত হয় লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ। জাফর নিমেরির বিরুদ্ধে সুদান জুড়ে আন্দোলন জোরদার হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যসহয়তার জন্য এক সফরে গেলে জাফর নিমেরি একটি রক্তহীন অভুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ১৯৮৬ সালে সুদানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । সাধারণ নির্বাচনে হাসান তুরাবীর ন্যাশনাল ইসলামীক ফ্রন্ট ৫০ টির অধিক আসন নিয়ে , সাদিক আল মাহদীর উম্মাহ পার্টির সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। ৫০ টি আসন একটি ইসলামপন্থী দলের জন্য ছিল অভ‚তপ‚র্ব সাফল্য এবং মানুষের মাঝে হাসান তুরাবী এবং তার দলের বিপ্লবী চিন্তাধারার একটি ফসল।

কিন্তু দীর্ঘদিন পর সুদানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা পুনুরুদ্ধারের ফসল বেশীদিন টিকেনি। ১৯৮৯ সালে পুনরায় এক সামরিক অভ্যুত্থানে ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেন , এবং ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত , দীর্ঘ ৩০ বছর একনায়ক ও শ্বৈরতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত রাখেন। এই দীর্ঘ সময়ে সুদানে রাজনৈতিক স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে তুরাবী ওমর আল বশিরকে পালটা অভুত্থানের মাধ্যমে হটানোর চেষ্টা করলেও সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এসময় তুরাবী জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তার বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামী আন্দোলনে ও বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গাগুলোতে আরো সক্রিয় ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হন । তবে তার রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। ১৯৯০-৯১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে হাসান তুরাবী সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন। এতে তিনি মার্কিনীদের চক্ষুশুলে পরিণত হন। বিন লাদেন , কার্লোস দের মত তৎকালীন সময়ের মোষ্ট ওয়ান্টেড ব্যাক্তিদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে তিনি পশ্চিমাদের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি একনায়ক ওমর আল বশিরের স্বৈরাচারী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জোট ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠন করেন।

হাসান আল তুরাবী রহ এর রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যমন্ডিত। তবে তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে কখনো পিছনা হননি। বিভিন্ন সময়ে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের কারণে রাজনৈতিক ভাবে নিজ দল ও দেশের জন্যও বড় বড় হুমকি বয়ে এনেছেন,কিন্তু তার রাজনৈতিক অভিষ্ট লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। মৌলিক আদর্শকে ধরে রেখে রাজনৈতিক কলাকৌশল বলদ করে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুদানের রাজনীতিতে অন্যতম প্রাসঙ্গিক ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তার সমালোচকদের পক্ষেও সুদানের জন্য তার রাজনৈতিক অবদান অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি।

হাসান তুরাবীর চিন্তা-বিপ্লব
হাসান তুরাবীর রাজনৈতিক সক্রিয়তার চেয়ে তার চিন্তা তৎপরতা পৃথিবীব্যাপী সুস‚রপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। হাসান তুরাবী যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশী একজন চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তাঁর চিন্তা সমসাময়িক যুগের যেকোন রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের চেয়ে ছিল অগ্রগণ্য।তিনি পড়ালেখা করেছেন আধুনিক পাশ্চত্য দর্শোনের আঁতুড়ঘর আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে। তিনি স্বেচ্ছায় লন্ডনের পরিবর্তে ফ্রান্সে অধ্যয়ন করেছিলেন , কেননা তার ইচ্ছা ছিল ইউরোপীয় আধুনিক দর্শনকে আরো কাছ থেকে দেখা ও উপলব্ধি করা।হাসান তুরাবী ছিলেন তৎকালীন সুদানের সমসাময়িক যেকোন ব্যাক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও চিন্তাগত দিক থেকে অগ্রসরমান। তিনি বংশগতভাবেই একটি শিক্ষিত ও চিন্তাব্দি পরিবারে সন্তান ছিলেন।

হাসান তুরাবীর ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা ছিল অপরাপর যেকোন চিন্তা থেকে মৌলিক। আমেরিকান রেভুলিউশনে মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সৃষ্টিগতভাবে স্বাধীন ও সমান সত্তা হিসেবে। ফরাসি বিপ্লবের ও অন্যতম অবদান ছিল ‘লিবার্টি’ এবং ‘ফ্রিডম’ । তিনি সম‚লে লিবার্টি এবং ফ্রিডম কে আঘাত না করে বললেন আমাদের সৃষ্টা আমাদের লিবারটি বা স্বাধীনতা প্রদান করেছেন । তিনি লিবারেলিজমকে হুমকি হিসেবে গ্রহণ না করে বরং ইসলামই যে লিবার্টি নিশ্চিত করেছে সে বিষয়টিতে বার বার জোর দেন।তিনি মনে করতেন;
‘The perfection of freedom requires total human submission to tawhid and freedom from enslavement to others.

‘প্রকৃত স্বাধীনতার দাবী হচ্ছে অন্যের গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে মহান আল­াহর একত্ববাদের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পন’ ।

তিনি আরো বলেন ,
‘Unitz cannot, therefore, be completed awaz from the tawhidi (unifzing) credal point of reference; or else it will be grounded in materialism, historicism, and positivism and subjected to narrow bonds, external threats, personal leadership or other humanlz devised reference points. But the exposition of unitz through concerns with individual rights and freedom is a conception alien to Islamic thought and developed along the historz of conflicts between the state and individuals within a Western context. Such conceptual unitz and freedom must not be superimposed on an Islamic context which has not witnessed that radical differentiation between the state, the individual and the Church, even during the commitment of the worst act of state deviation that turned government into hereditarz rule.’ (৮)

তিনি তাওহীদ ব্যাতীত মানুষের ঐক্যকে পূর্ণাঙ্গ মনে করতেন না। তাওহীদ ব্যাতীত ঐক্যের সকল উপাদানকে তিনি একটি সীমাবদ্ধ গন্ডি মনে করতেন। এবং পাশ্চত্যের চিন্তা ভাবনা, যা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে নতুন সংকট তৈরি করেছে, সে সব বিষয়ে তিনি প‚র্ণ সচেতন ছিলেন।হাসান তুরাবীর মতে একটি ইসলামী রাষ্ট্র কখনোই সমাজ বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা। বরং ইসলাম একটি ব্যাপক ও সুসংহত রাষ্ট্র ব্যাবস্থা যেখানে মানুষে স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।হাসান তুরাবী প্রাইভেট/পাব্লিক, রাষ্ট্রীয়/সামাজিক বিভাজনকে স্বীকার করতেন না এবং এটিকে একটি পাশ্চত্য ব্যাবস্থার দুর্বলতা হিসেবে ভাবতেন। (৯)

তাওহীদের ভিত্তিতে যে ইসলামী রাষ্ট্রব্যাবস্থা তৈরি হবে তার ভিত্তি হবে সেটি নিছক কোন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হবেনা সেটি হবে বৃহত্তর উম্মাহ ধারণাকে সামনে নিয়ে। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে খারিজ করে , একটি সৃষ্টার প্রতি উৎসর্গীকৃত সমাজের চিত্র এঁকেছেন ।বৃটিশ টিভি ‘ চ্যানেল ফোর” কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হসান তুরাবী ইসলামী রাষ্ট্রব্যাবস্থা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তিনি খ্রিষ্ট্রীয় ধর্ম রাষ্ট্রে ধর্মগুরু বা মোল্লাতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামী সমাজে আলেম ওলামাদের আইনজ্ঞ,বিচারক কিংবা এডভোকেট হিসেবে কল্পনা করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মুসলিমরাই অংশগ্রহণ করবে , তবে রাষ্ট্রীয় আইন এবং ফিকাহ শাস্ত্রে আলেম ওলামাদের অবদান থাকবে। তিনি সচেতনভাবে গোড়াবাদী রাষ্ট্রের বিরোধীতা করতেন , তিনি মনে করতেন ইসলাম একটি যুগোপযোগী জীবন ব্যাবস্থা। সেখানে প‚র্বেকার আইন-কানুন ও দেখানো নিয়ম মানতে মানুষকে বাধ্য করা যাবেনা । তিনি ফ্রি-ট্রেড অর্থনীতিকে ন্যায় ও সাম্যের ভিত্তিতে অনুমোদনের পক্ষে ছিলেন। একটি আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক গড়তে তিনি পূর্ব পশ্চিম সকল রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সুস্ম্পর্কের উপর জোর দিয়েছেন। (১০)

সুদানের দক্ষিণভাগে যখন রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল , তখন তিনি দক্ষিণ সুদানী যারা ম‚লত আনারব ও বেশীরভাগই অমুসলিম তাদের উপর ইসলামী শরিয়া আইনের বাধ্যবাধকতাকে জরুরী মনে করেন নি। তাদের সায়ত্বশাসন ও নিজস্ব আইন প্রণয়নী ক্ষমতা থাকাটা ইসলামী রাষ্ট্রেরই একটি সুসং হত রূপ বলে মনে করতেন। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ণেও অমুসলিমদের অংশগ্রহণ থাকাকে তিনি জরুরী হিসেবে বিচেচনা করেছেন।ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী রূপকে তিনি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন , ইসলামী রাষ্ট্র কখনো ‘এবসুলিউট’ নয় বরং এখানে রাষ্ট্র স্বয়ং সৃষ্টার নিকট দায়বদ্ধ থাকবে। একটি ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদের সামন মর্যাদা ও অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন হাসান তুরাবী।তিনি একটি ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং এই উপলব্ধিকে তিনি সুদানে বাস্তব রূপদানে সক্ষম হয়েছিলেন ।সুদানে তাদের দলের অধীনে ‘ন্যাশনাল ওয়েমেন ফ্রন্ট “ নামে একটি শক্তিশালী নারী অধিকার সংস্থা কাজ করত।

নারীদের পোশাক নিয়ে বৃটিশ সাংবাদিকদের জবাবে হাসান তুরাবী বলেন, একটি ইসলামী রাষ্ট্র নারীদের পোশাক নিয়ে ভাববে না বরং ইসলাম শালীন পোশাকের পরামর্শ দেয়। তবে কেউ যদি পাশ্চত্য পোশাক পরে তাতে ইসলামী রাষ্ট্রের কোন হস্তক্ষেপ থাকবেনা বলেও তিনি অভিহিত করেছেন। (১১)

চলবে……………

 

তথ্যসুত্রঃ
১.Hasan Turabi, The last of the islamist: The man and his times, 1932-2016.

২. Natsios, Andrew S. (2012). Sudan, South Sudan, and Darfur: What Everzone Needs to Know. Oxford Universitz Press. pp. 85–6. Retrieved 22 April 2015.

৩. Hassan-Al Turabi obituarz, The Guardian, <https://www.theguardian.com/world/2016/mar/11/hassan-al-turabi-obituarz >

৪. Profile, SudanÕs Islamist Leader, BBC News 15 Januarz, 2009

৫. Sudan: Hassan-Al TurabiÕs life and politics, Aljazeera Documentarz.

৬. প্রাগুক্ত,
৭.প্রাগুক্ত,

৮. Al-Turabi, Qadaza al-hurizza wa al-wahda wa al-shura wa al-dimucratizza (Issues of Freedom,Unitz, Shura and Democracz) (Jedda: 1987), pp.10-1).

৯। প্রাগুক্ত,
১০। জিয়াউদ্দীন সরদার, ইসলামী রাষ্ট্রব্যাবস্থা নিয়ে ড.তুরাবী , ‘ইসলামিক কনভারসেশনস’-এ ২০১২, চ্যানেল ফোর , ইউকে।
১১।প্রাগুক্ত,

 

 

Related posts

Top