সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসির-৫

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসির-৫

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসির-৫

মুফতি আব্দুর রহমান গিলমান

“প্রতিদান দিবসের মালিক”

সুরায়ে ফাতেহার তৃতীয় আয়াত হচ্ছে- ‘মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন’। অর্থাৎ ‘প্রতিদান দিবসের মালিক।’ মা-লিক শব্দটি এখানে মীম-এ আলিফ দিয়ে পড়া হয়েছে। কোনো কোনো কিরাআতে আলিফ ব্যতীতও পড়া হয়েছে। মুফাসসিরীনে কিরাম দুয়ের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন এভাবে, ‘মালিক’ (আলিফ ব্যতীত) বলতে বুঝায় যিনি তার প্রজা ও অনুগতদের সাধারণ কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত বিশেষ কাজ ও ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আর ‘মা-লিক’ (আলিফ সহকারে) যিনি সর্ববিষয়ে নিয়ন্ত্রণকারী। পূর্বের অর্থের চেয়ে এটি আরও ব্যাপক। তার কারণ হলো- মালিক এর চেয়ে মা-লিক এর মধ্যে একটি অক্ষর বেশি। আর আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী অক্ষরের আধিক্যের কারণে অর্থের মাঝে ব্যাপকতা আসে। ‘মা-লিক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে- মালিক, স্বত্বাধিকারী, একচ্ছত্র অধিপতি ইত্যাদি।

‘ইয়াওম’ সাধারণত সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত সময়কে বলে। শরীয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক হকে সূর্যাস্ত সময়কে ‘ইয়াওম’ বলে। তাছাড়া আরবি ভাষায় ‘ইয়াওম’ শব্দটি সময় বা কাল অর্থেও ব্যবহার হয়। আর এখানেও সে অর্থে ব্যবহার হয়েছে। দীন শব্দটি কুরআনুল কারিমে কয়েকটি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যেমন- ১. বাদশাহী বা রাজত্ব (সুরা ইউসুফ-৭৬), ২. পথ (সুরা কাফিরুন-৬), ৩. নির্দেশ বা হুকুম (সুরা আনফাল-৩৯), ৪. বিধান যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনিত করেছেন (সুরা শুরা-১৩), ৫. আনুগত্য (সুরা নাহল-৫২) ৬. প্রতিদান (সুরা যারিয়াত-৬)। সুরায়ে ফাতিহার এই আয়াতে দীন দ্বারা এই প্রতিদান-ই বুঝানো হয়েছে।

পারিভাষিকভাবে দীন বলা হয়, ঐ সমস্ত বিধানাবলীকে যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে বান্দার ওপর অর্পিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, দীন বলা হয় মহান আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি জিবন বিধান, যা বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন সৃষ্টিকে তাদের প্রশংসনীয় পছন্দ ও শুভ বিবেচনার মাধ্যমে চিরকল্যাণের দিকে পরিচালিত করে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার যে, ইতোপূর্বে রাব্বুল আলামীন দ্বারা বুঝিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া এবং আখিরাতের সব কিছুর মালিক। কিন্তু এখন আবার ‘মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন’ বলার কী প্রয়োজন ছিলো? প্রশ্নটা এভাবেও উত্থাপন করা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে প্রতিদান দিবসের মালিক তেমনি দুনিয়ার জগতেরও মালিক। তাহলে এখানে প্রতিদান দিবসকে কেন নির্দিষ্ট করা হলো?

উভয় প্রশ্নের উত্তরে মুফাসসিরীনে কিরাম বলেছেন, দুনিয়াতে মানুষ সাময়িকভাবে অনেক কিছুর মালিক হয়। যেমন- ক্ষমতা, টাকা-পয়সা, জায়গা-যমীন ইত্যাদি। কিন্তু তাদের এই মালিকানা একদম সীমিত। আজ আছে কাল নেই। অথচ আল্লাহ তা‘আলার মালিকানা চিরস্থায়ী। তাছাড়াও মানুষ দুনিয়াতে অনেক কিছুর দাবি করলেও তা এখানেই শেষ। বিচার দিবসে সামান্য কিছুরও মালিক হতে পারবে না। তাইতো আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন- ‘আজকের রাজত্ব কার? (তিনি নিজেই উত্তর দিবেন) এক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর’Ñসুরা মুমিন-১৬। ক্ষমতা, পদ বা দায়িত্ব, অর্থকড়ি, বংশ ইত্যাদির বড়াই সেদিন কোনো কাজে আসবে না।

সুরায়ে ফাতিহার উক্ত তিন আয়াত দ্বারা মুসলমানদের বিশেষ তিনটি আকিদাÑ তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত প্রমাণিত হয়। প্রথম আয়াত দ্বারা তাওহিদ তথা আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ প্রমাণিত হয়। আর তা এভাবে যে, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেনÑ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি সমগ্র জাহানের প্রতিপালক। সমগ্র জাহানের প্রতিপালক তিনিই হতে পারেন যিনি তা সৃষ্টি করেছেন। এ কথা স্পষ্ট যে, সমস্ত জাহানের সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তাঁর ইশারায় আসমান-যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনিই সব কিছুকে সুচারুভাবে পরিচালনা করেন। এই বিশ্বপরিমÐল পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যদি অন্য কেউ থাকত তাহলে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যেত। এতেই আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ প্রমাণিত হয়।

দ্বিতীয় আয়াতে রিসালাত প্রমাণিত হয় এভাবেÑ তিনি অসীম দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর দয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, তিনি মানুষ সৃষ্টি করে তাদেরকে ভালো এবং মন্দের পথ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। যদি তিনি মানুষ সৃষ্টি করেই ক্ষ্যান্ত থাকতেন, তাদেরকে কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ তা পরিচয় করিয়ে না দিতেন, কোনটি সফলতার পথ আর কোনটি ধ্বংসের পথ তা জানিয়ে না দিতেন, তাহলে মানুষের প্রতি তাঁর দয়ার পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হতো না। তাই তিনি অনুগ্রহ করে ভালো-মন্দের পথ চিনিয়ে দিয়েছেন। আর একাজটি করেছেন তিনি আম্বিয়ায়ে কিরাম আ. প্রেরণের দ্বারা। অর্থাৎ নবীগণ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে মানুষকে ভালো এবং মন্দের পথ সম্পর্কে অবহিত করেছেন, যাতে মানুষ মন্দ পথ ছেড়ে ভালোর পথে পরিচালিত হয়। তাই মানুষদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য নবী-রাসুলদের প্রেরণ আল্লাহ তা‘আলার অনেক বড় অনুগ্রহ। আর নবী-রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন-ই হলো রিসালাত সংক্রান্ত আকিদা।

তৃতীয় আয়াত দ্বারা আখিরাত প্রমাণিত হওয়া স্পষ্ট। প্রতিদান দিবস মানেই হলো আখিরাত। এই আয়াত থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, এই আয়াতের তাৎপর্য যদি সর্বদা আমাদের মানস্পটে থাকে, তাহলে আমরা প্রত্যেকেই পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত আদর্শ জীবন গঠন করতে পারবো। কারণ যখনই আমি কোনো অন্যায় কাজ করতে যাবো তখন যদি এই কথা স্মরণ আসে যে, এর জন্য আমাকে জবাবদিহী করতে হবে, এর প্রতিদান আমাকে কাল কিয়ামতে প্রদান করা হবে, তখন হয়তো এই ভয়ে হলেও আমি সেই কাজ থেকে বিরত থাকবো। অনুরূপভাবে নেক কাজ করতে গেলেও এ কথা স্মরণ আসলে সে কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এভাবে ন্যায় ও নেকের কাজে আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারলে আমরা আদর্শ মানুষে পরিণত হবো। আমরা আদর্শ মানুষ হলে সমাজ- ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রও আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

 

 

 

Related posts

Top