সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৬

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৬

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৬

মুফতি আব্দুর রহমান গিলমান

“আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।” (আয়াত-৪)

সুরা ফাতিহার চতুর্থ আয়াতটি হলÑ “ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকানাস্তাঈন”। অর্থাৎ আমরা শুধু তোমারই উপাসনা করি এবং একমাত্র তোমার কাছ থেকে সাহায্য চাই।
পূর্বের আয়াতগুলোয় আমরা আল্লাহর কিছু গুণ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আমরা জেনেছি যে তিনি “রহমান”, “রাহিম”, “রাব্বুল আলামিন” এবং বিচার দিনের মালিক। এ ছাড়াও এ অন্তহীন বিশ্বজগত এবং আমাদের প্রতি তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করে বলেছি “আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন”।

তাই আমাদের কর্তব্য হল তাঁর দরবারে গিয়ে নিজের অক্ষমতা ও দুর্বলতা তুলে ধরে বলা যে, আমরা একমাত্র তোমারই বান্দা এবং একমাত্র তোমার নির্দেশ ছাড়া অন্য কারো কাছে বা নির্দেশের সামনে মাথা নত করব না। আমরা দুনিয়ার ধন দৌলতের পূজারী নই এবং শোষক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরও গোলাম নই।

সুরায়ে ফাতিহার এই আয়াতের দুটি অংশ। প্রথম অংশে আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি, আমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার-ই ইবাদত করি। অন্য কারো ইবাদত করি না। ইবাদত মানে হুকুম পালন করা, নির্দেশ মানা, আনুগত্য করা। পারিভাষিকভাবেÑ দৈনন্দিন জীবনের সব কাজ-কর্মে আল্লাহ তা‘আলার বিধি-বিধান মেনে চলাকে ইবাদত বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়, কোনো সত্তাকে গায়েবীভাবে ভালমন্দের মালিক এবং সকল প্রয়োজন পূর্ণ করার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করে তাঁর সামনে নিজের নিতান্ত হীনতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশের জন্য, তাকে রাজি-খুশি করার জন্য এবং তাঁর নৈকট্য অর্জনের জন্য যেসব উপাসনামূলক কাজ করা হয় তাকেই ইবাদত বলে।

আমরা আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পালন করি- কারণ, আমরা তাঁর বান্দা। বান্দা হিসেবে আমাদেরকে বন্দেগী করতেই হবে। আমরা যেহেতু সার্বক্ষণিক আল্লাহ তা‘আলার বান্দা তাই সার্বক্ষণিক তাঁর ইবাদত করতে হবে। সার্বক্ষণিক ইবাদতের অর্থ হলÑ আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অনুযায়ী হতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক কাজ, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ইত্যাদি সকল কাজ তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী করতে হবে।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আমরা স্বীকার করছি, আমরা কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই। আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করাও একটি অন্যতম ইবাদত। এমনকি আমরা ইবাদতও আল্লাহর সাহায্যে করি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য না করলে হয়তো আমরা অন্যদের গোলাম ও দাসে পরিণত হতাম। যে যত বেশি আল্লাহর ইবাদতকারী, সে তত বেশি তাঁর সাহায্যপ্রার্থী। তাই দেখা গেছে, দুনিয়ায় প্রেরিত নবী-রাসুলরা আল্লাহর কাছে বেশি বেশি সাহায্য চাইতেন। বিখ্যাত অলি-আউলিয়াদের অভ্যাসও এমন ছিল।

এখানে কোন বিষয়ে আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই তা উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, দুনিয়া-আখিরাতের সকল বিষয়েই আমরা তাঁর সাহায্য চাই। আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত যেভাবে আমাদের আখিরাতের মুক্তি সম্ভব নয়; তদ্রæপ দুনিয়াবী সকল কাজও তাঁর সাহায্য ব্যতীত সম্পাদন করা আমাদের জন্য অসম্ভব। ব্যক্তিগত ছোটখাট কাজ থেকে শুরু করে পরিবার পরিচালনা, সমাজ পরিচালনা, সংগঠন পরিচালনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সকল কাজে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কাউকে প্রকৃত সাহায্যকারী মনে করলে তা শিরক হবে। কোন রাষ্ট্র, পীর, মাজার ইত্যাদিকে প্রকৃত সাহায্যকারী মনে করা, অমুক রাষ্ট্র সাহায্য না করলে আমাদের রাষ্ট্র চলবে না, অমুক পীর সাহায্য না করলে আমার মুক্তি হবে নাÑ ইত্যাদি বিশ্বাস রাখা আল্লাহ তা‘আলার সাথে চরম পর্যায়ের শিরক হবে।দুনিয়ার মানুষের কাছে চাইলে বিরক্তিবোধ করে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা ভিন্ন। তাঁর কাছে না চাইলে তিনি রাগ করেন। তাইতো তিরমিজী শরিফের হাদিসে এসেছেÑ ‘যে আল্লাহর কাছে কিছু চায় না আল্লাহ তার ওপর রাগ করেন।
সুরা ফাতিহার ৪র্থ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলÑ নামাজের মধ্যে আমরা যেভাবে সুরা ফাতিহা পাঠ করে আল্লাহর ইবাদতের এবং তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনার স্বীকৃতি দিয়ে থাকি, নামাজের বাইরেও সেই স্বীকৃতির কথা স্মরণ রাখতে হবে।

আয়াত থেকে আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হল, প্রত্যেক নামাজে যদি আমরা গভীর উপলদ্ধির সাথে বলি যে, আমরা কেবল তোমারই বান্দা; তাহলে আমাদের মধ্য থেকে গর্ব, অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য দূর হয়ে যাবে।

 

Related posts

Top