সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৮

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৮

সুরা ফাতিহার ধারাবাহিক তাফসীর-৮ (আয়াত-৬)

মুফতি আব্দুর রহমান গিলমান

“যারা আপনার অনুগ্রহ লাভ করেছে তাঁদের পথ”

“সিরাতাল্লাযিনা আন‘আমতা আলাইহিম” অর্থাৎ তাঁদের পথ যারা আপনার নি‘আমত বা অনুগ্রহ লাভ করেছে। এ আয়াতটি পূর্বের আয়াত “ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম”-এর ব্যাখ্যা। যারা আপনার অনুগ্রহ বা দয়া পেয়েছে তাঁদের পথই সোজা-সরল রাস্তা। এতে করে এ কথাটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, ঐ সমস্ত প্রিয়জন লোকের পথ যাদের মুস্তাকিম হওয়ার বিষয়টি সুস্বীকৃত। এর অর্থ দাঁড়াবে এরকম- হে আল্লাহ্! আমাদেরকে ঐ সমস্ত লোকের পথানুগামী কর, যাঁদেরকে তুমি করুণা সিক্ত করেছ। ঐ অনুগ্রহপ্রাপ্ত লোকেরাই ঈমান ও আনুগত্যের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত। আর করুণাসিক্ত বা অনুগ্রহপ্রাপ্ত প্রিয়ভাজন কারা আল্লাহ তা‘আলা নিজেই কুরআনের অন্যত্র জানিয়ে দিয়েছেন- “নি‘আমতপ্রাপ্তরা হলেন নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহিদগণ ও সালেহিনগণ।” আল্লাহ’র দরবারে মকবুল উপরোক্ত লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর নবীগণের। অতঃপর নবীগণের উম্মতের মধ্যে যারা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, তাঁরা হলেন ‘সিদ্দিক’ যাদের মধ্যে রূহানী কামালিয়াত ও পরিপূর্ণতা রয়েছে। আর যারা দীনের প্রয়োজনে স্বীয় জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে বলা হয় শহিদ। আর সালেহিন হলো সৎকর্ম পরায়ণশীল তাঁরা আউলিয়ায়ে কিরামের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, বুজুর্গানে দীন বা আউলিয়ায়ে কিরাম যে সকল আমল করেছেন বা যে পথে চলেছেন তা-ই ‘সিরাতুল মুস্তাকিম।’ এছাড়া এটাও প্রমাণিত হল যে- হজরতআবু বকর সিদ্দীক রা.-এর খেলাফত হক বা সঠিক। কেননা সিদ্দীকিনদের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেন আবু বকর সিদ্দীক রা.।

ভাষাতাত্তি¡ক দিক থেকে আনআ’মা এসেছে “নুউ’মা” থেকে, যার অর্থ নম্র, শান্ত, শিথিল ইত্যাদি। যেমন গরু, ভেড়াকে আনআ’ম বলা হয়, কারণ তারা সবসময়ই শান্ত, ধিরস্থির থাকে। আল্লাহ এখানে আনআ’মা শব্দটি ব্যবহার করে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, যারা সিরাতুল মুস্তাকিমে চলে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, তাদের ওপরে আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করেছেন। তারা এখন শান্ত, শিথিল।

বান্দার উপকারার্থে আল্লাহ তা‘আলা যাই প্রদান করেন তাই নি‘আমত। এই নি‘আমত তিন প্রকার। এক. যা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত। এতে অন্য কারো কোন হস্তক্ষেপ নেই। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আলো, বাতাস দান করছেন ইত্যাদি। দুই. বাহ্যিকভাবে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো থেকে প্রাপ্ত। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তাও আল্লাহ তা‘আলা থেকে প্রাপ্ত। কেননা ঐ নি‘আমতটাও আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন। নি‘আমতদাতাকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন, ঐ ব্যক্তিকে নি‘আমত দেওয়ার ইচ্ছা তার অন্তরে আল্লাহ তা‘আলাই দিয়েছেন। তিন. আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের ফলে তিনি আমাদেরকে যে নি‘আমত দান করেছেন। এটিও মূলতঃ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকেই। কারণ, তিনি যদি আমাদেরকে ইবাদতের শক্তি না দিতেন, সহযোগিতা না করতেন তাহলে আমরা ইবাদত করতে পারতাম না। সুতরাং এটাই স্পষ্ট কথা- যত ধরণের নি‘আমতই আমরা ভোগ করি না কেন, সবই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আসে।

সরল পথ নির্ধারণের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক স্বীয় বান্দাদের তালিকা প্রদান দ্বারা এই বিষয়ে ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে- শুধুমাত্র কিতাবের পাঠই পূর্ণ তালিম ও তারবিয়াতের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং কোন বিজ্ঞ লোকের নিকট এর শিক্ষা লাভ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বুঝা গেল- মানুষের প্রকৃত মুক্তি এবং কল্যাণপ্রাপ্তির জন্য দুটি উপাদানের প্রয়োজন। প্রথমতঃ আল্লাহর কিতাব- যাতে মানবজীবনের সকল দিকের পথনির্দেশ রয়েছে। অপরটি হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা আল্লাহওয়ালাগণ। তাঁদের কাছ থেকে ফায়দা হাসিল করার মাপকাঠি হচ্ছে এই যে- আল্লাহর কিতাবের নিরিখে তাঁদেরকে পরীক্ষা করতে হবে। এ পরীক্ষায় যারা টিকবে না তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র নয়। আর কুরআনের নিরিখে যারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র স্থির হয় তাঁদের নিকট আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা লাভ করে সে অনুযায়ী আমল করতে হবে।

ইমাম রাযি রহ. স্বীয় তাফসিরে কাবির-এ “আন‘আমতা আলাইহিম”-এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন- ‘আল্লাহ তা‘আলা শুধু “ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম” বলে ক্ষ্যান্ত হননি; বরং সাথে সাথে “সিরাতাল্লাযিনা আন‘আমতা আলাইহিম”ও বলেছেন। এর দ্বারা এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে- হিদায়াতের চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে হলে এমন একজন শাইখের অনুসরণ করতে হবে যিনি তাকে হিদায়াতের চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পথপ্রদর্শন করবেন। তাকে পথভ্রষ্ট এবং ভুলপথে পরিচালিত হওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখবেন। শাইখ বা মুর্শিদের অনুসরণ করাটা এজন্যই জরুরি যে, অধিকাংশ মানুষের জ্ঞান স্বল্প। এই জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তারা ধর্মীয় বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারে না। সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। তাই কুরআন-হাদিসের জ্ঞানে পূর্ণাঙ্গ এমন একজন ব্যক্তির অনুসরণ জরুরি যিনি এই স্বল্প জ্ঞানের মানুষটিকে পথপ্রদর্শন করবে। স্বল্প জ্ঞানের লোকটি তাঁর সংস্পর্শে থেকে ফয়েজ ও কামালাত অর্জন করবে। ক্রমান্বয়ে সে সৌভাগ্যের সোপান এবং পূর্ণাঙ্গতার সিঁড়ি অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। পীর বা মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে এটি একটি অকাট্য দলিল।

Related posts

Top